
চট্টগ্রামে কয়েক দিন আগেও উৎসবের রঙ ছিল বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতে আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল ছিল স্বাগতিকরা। কিন্তু ক্রিকেটের গল্প সব সময় একরকম থাকে না। ফরম্যাট বদলালে বদলে যায় ছন্দ, বদলে যায় সমীকরণও।
বুধবার বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচে সেই বাস্তবতাই নতুন করে মনে করিয়ে দিল অস্ট্রেলিয়া। ব্যাট হাতে বাংলাদেশের ব্যর্থতা আর কুপার কনলির ঝোড়ো ইনিংসে ৪ উইকেটের জয় নিয়ে সিরিজ শুরু করেছে সফরকারীরা।
১৩২ রানের লক্ষ্য টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে খুব বড় নয়। তবে চট্টগ্রামের উইকেট পুরোপুরি ব্যাটিংবান্ধবও ছিল না। বল কিছুটা থেমে আসছিল, গ্রিপ করছিল, ব্যাটারদের শট খেলতে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হচ্ছিল। এমন উইকেটে লড়াই করার মতো সংগ্রহ গড়তে পারেনি বাংলাদেশ।
ফলও তাই হয়েছে।
ভালো শুরু, তারপর পরিচিত ধস
নিয়মিত অধিনায়ক লিটন দাসকে ছাড়াই মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। চোটের কারণে একাদশের বাইরে থাকা লিটনের পরিবর্তে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেন তাওহিদ হৃদয়।
শুরুটা খারাপ হয়নি। সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান মিলে পাওয়ারপ্লেতে দ্রুত রান তুলছিলেন। মাত্র ৩ ওভারে স্কোরবোর্ডে উঠে যায় ২৭ রান।
কিন্তু প্রথম উইকেট পতনের পরই যেন ব্যাটিং লাইনআপে নেমে আসে অস্থিরতা।
তানজিদের বিদায়ের পর সাইফও ফেরেন। এরপর সৌম্য সরকার, তাওহিদ হৃদয়, পারভেজ হোসেন, শামীম হোসেন—কেউই ইনিংস বড় করতে পারেননি।
একসময় বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৮৬ রানে ৭ উইকেট।
ওই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, একশ রানও বুঝি হবে না।
মেহেদীর লড়াই
ব্যাটিং ধসের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন শেখ মেহেদী হাসান।
নিচের সারির ব্যাটার হয়েও তিনিই সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ গড়েন। দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আক্রমণও চালান।
২২ বলে ২৯ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি।
অভিষিক্ত আব্দুল গাফফার সাকলায়েনও কিছুটা সঙ্গ দেন। শেষ উইকেট জুটির ২৩ রান বাংলাদেশের স্কোরকে অন্তত লড়াই করার মতো জায়গায় নিয়ে যায়।
তবু ১৯ ওভারে ১৩১ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির কিছু ছিল না।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে অ্যাডাম জাম্পা ও জোয়েল ডেভিয়েস তিনটি করে উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিংকে কার্যত গুঁড়িয়ে দেন।
শুরুতেই আশা দেখালেন বোলাররা
১৩২ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়াও নির্বিঘ্ন শুরু পায়নি।
শরীফুল ইসলামের দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে যান জশ ইংলিস। এরপর মোস্তাফিজুর রহমান ফেরান মিচেল মার্শকে।
মাত্র ৩৮ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে সফরকারীরা।
স্টেডিয়ামে তখনও বাংলাদেশি সমর্থকদের আশা বেঁচে ছিল।
কিন্তু সেই আশার সামনে দাঁড়িয়ে যান কুপার কনলি।
কনলির ঝড়েই ম্যাচের মোড়
ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচে সেঞ্চুরি করা কনলি এদিনও ছিলেন দুর্দান্ত।
উইকেটের আচরণ বুঝে শুরু করলেও পরে ধীরে ধীরে গতি বাড়ান তিনি। বাংলাদেশি বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করেন এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন।
টিম ডেভিডকে সঙ্গে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন এই বাঁহাতি ব্যাটার।
অভিষিক্ত আব্দুল গাফফার সাকলাইনের ওভারে টানা ছক্কা-চার মেরে ফিফটির কাছাকাছি পৌঁছে যান কনলি। শেষ পর্যন্ত ২৭ বলে ৪৭ রান করে আউট হলেও ততক্ষণে ম্যাচ প্রায় অস্ট্রেলিয়ার মুঠোয়।
তার ইনিংসে ছিল আগ্রাসন, আত্মবিশ্বাস এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার পরিপক্বতা।
শেষ দিকে সামান্য প্রতিরোধ
কনলির বিদায়ের পর টিম ডেভিডও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। শেখ মেহেদীর বলে আউট হন তিনি।
অভিষিক্ত আব্দুল গাফফারও দুটি উইকেট তুলে নিয়ে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা স্মরণীয় করে রাখেন।
তবে লক্ষ্য ছিল ছোট। ম্যাট রেনশ ও জেভিয়ার বার্টলেট শেষ পর্যন্ত কোনো নাটকীয়তার সুযোগ না দিয়ে ম্যাচ শেষ করে দেন।
১৮.২ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ১৩৩ রান তুলে নেয় অস্ট্রেলিয়া।
যে জায়গায় হারল বাংলাদেশ
ম্যাচের সবচেয়ে বড় পার্থক্য ছিল দুই দলের ব্যাটিংয়ের মানসিকতায়।
যে উইকেটে বাংলাদেশ নিয়মিত উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায়, একই উইকেটে কনলি বুঝিয়ে দেন কীভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে ইনিংস গড়া যায়।
বাংলাদেশের ব্যাটাররা কেউই দায়িত্ব নিয়ে বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ফলে বোলারদের জন্য রক্ষার মতো রানও ছিল না।
ওয়ানডে সিরিজ জয়ের আনন্দ নিয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজে নামা বাংলাদেশ তাই শুরুতেই হোঁচট খেল।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া দেখিয়ে দিল, এক ফরম্যাটের হতাশা আরেক ফরম্যাটে তারা বয়ে নিয়ে যেতে রাজি নয়।
চার উইকেটের জয় দিয়ে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল সফরকারীরা।