
চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখনও আশার আলো জ্বলছিল। শেষ তিন বলে দরকার ১৮ রান। ক্রিজে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়। প্রথম বলেই বিশাল এক ছক্কা। গ্যালারিতে হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়ে নতুন স্বপ্ন। পরের বলে চার। হিসাবটা তখন অসম্ভব নয়, কঠিন মাত্র।
কিন্তু ক্রিকেট কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর গল্পেরও অসমাপ্ত সমাপ্তি লিখে দেয়।
শেষ বলে বড় শট খেলতে গিয়ে বাউন্ডারি লাইনে ধরা পড়লেন হৃদয়। আর তাতেই ৭ রানের হৃদয়ভাঙা হার নিয়ে মাঠ ছাড়ল বাংলাদেশ। ১৯৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে টাইগাররা থামল ১৮৯ রানে। সেই সঙ্গে এক ম্যাচ হাতে রেখেই টি-টোয়েন্টি সিরিজ নিশ্চিত করে ফেলল অস্ট্রেলিয়া।
স্বপ্নের শুরু
চট্টগ্রামের দর্শকরা ম্যাচের শুরুতেই পেয়েছিলেন বিনোদনের পুরো প্যাকেজ।
তানজিদ হাসান তামিম আর সাইফ হাসান যেন শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মাত্র দুই ওভারেই আসে ৩৩ রান। তিন ওভার শেষে স্কোরবোর্ডে ৪২ রান।
স্টেডিয়ামের চারদিকে তখন একটাই আলোচনা- ‘আজ কি তবে সিরিজে ফিরছে বাংলাদেশ?’
তানজিদ মাত্র ১৫ বলে ৩০ রান করে আউট হলেও নিজের কাজটা করে গিয়েছিলেন। চারটি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো ইনিংসটি বাংলাদেশের রান তাড়ার ভিত গড়ে দেয়।
এরপর সৌম্য সরকারও থেমে থাকেননি। মাত্র ৯ বলে ১৫ রান করে আক্রমণাত্মক মানসিকতারই পরিচয় দেন।
ম্যাচের মোড় ঘুরল কোথায়?
অনেক দিন পর আন্তর্জাতিক ম্যাচে সুযোগ পাওয়া সাইফ হাসান খেললেন দায়িত্বশীল ইনিংস। অপর প্রান্তে পারভেজ হোসেন ইমন ছিলেন আরও বেশি আগ্রাসী।
দুজনের ৫৩ রানের জুটি ম্যাচকে বাংলাদেশের নাগালের মধ্যেই রেখেছিল।
১২ ওভার শেষে বাংলাদেশের রান ছিল ১২২/২।
তখন প্রয়োজন ছিল ৪৮ বলে ৭৫ রান।
আর ১০ ওভার শেষে স্কোরবোর্ড বলছিল আরও আশাব্যঞ্জক গল্প—১০ ওভারে ১০৩ রান।
সেখান থেকেই ম্যাচ হাতছাড়া।
প্রথমে পারভেজ (৩৬), পরে সাইফ (৪২) ফিরে গেলে মাঝের ওভারগুলোতে গতি হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। শামীম হোসেনও বড় কিছু করতে পারেননি।
শেষ পাঁচ ওভারে প্রয়োজন ছিল ৫৪ রান। আধুনিক টি-টোয়েন্টিতে যা অসম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটাররা সেই গতি ধরে রাখতে পারেননি।
রেনশ নামের ঝড়
এর আগে টস হেরে ফিল্ডিংয়ে নামা বাংলাদেশ শুরুটা করেছিল প্রায় নিখুঁতভাবে।
নাসুম আহমেদ এলবিডব্লিউ করেন জশ ইংলিসকে। এরপর নাহিদ রানার গতির কাছে হার মানেন সিরিজজুড়ে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা কুপার কনোলি। পাওয়ারপ্লের মধ্যেই মোস্তাফিজুর রহমানের বলে ফিরে যান অধিনায়ক মিচেল মার্শও।
৬ ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার রান ছিল মাত্র ৪৩/৩।
সেই মুহূর্তে ম্যাচ পুরোপুরি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু সেখানেই আবির্ভাব ম্যাট রেনশ ও টিম ডেভিডের।
চতুর্থ উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ৯৭ রানের জুটি। ডেভিড ২৬ বলে ৪৫ রান করে ফিরলেও রেনশ ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।
রিশাদ হোসেনের এক ওভারে টানা তিন ছক্কা মেরে তুলে নেন ফিফটি। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ৫২ বলে ৮৯ রান করে। চারটি চার আর পাঁচটি ছক্কায় সাজানো ইনিংসটি ম্যাচের সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে নাসুম আহমেদ ছিলেন সবচেয়ে সফল। চার ওভারে মাত্র ২৭ রান দিয়ে নেন দুটি উইকেট।
হার, কিন্তু আশা জাগানিয়া লড়াই
স্কোরকার্ড বলবে বাংলাদেশ ৭ রানে হেরেছে।
কিন্তু চট্টগ্রামের দর্শকরা জানেন, এই ম্যাচে বাংলাদেশ অনেকটা সময় জয়ের পথেই ছিল।
একদিকে নাহিদ রানার গতির ঝলক, অন্যদিকে নাসুমের নিয়ন্ত্রিত বোলিং। ব্যাট হাতে তানজিদের বিস্ফোরক শুরু, সাইফের প্রত্যাবর্তন, পারভেজের আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং—সব মিলিয়ে ইতিবাচক অনেক কিছুই দেখেছে বাংলাদেশ।
তবু টি-টোয়েন্টির নির্মম বাস্তবতা হলো, ৪০ ওভারের ম্যাচে কয়েকটি ওভারই ভাগ্য বদলে দেয়।
চট্টগ্রামের রাত তাই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য আফসোসের গল্প হয়ে রইল।
গ্যালারিতে জয়ের গন্ধ ছিল, ম্যাচে ছিল প্রত্যাবর্তনের আশা, কিন্তু শেষ হাসিটা হাসল অস্ট্রেলিয়াই।