
হাটহাজারীর জোবরা গ্রামের এক তরুণ। একদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ক্লাসরুম, অন্যদিকে ফতেপুর ইউনিয়নের পথঘাটে ছাত্ররাজনীতির ব্যস্ততা। সময়টা ১৯৮০ সাল। দেশের রাজনীতি তখন উত্তাল; স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্রসমাজ। সেই সময়ে ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব নেন নূর মোহাম্মদ।
চার দশকের বেশি সময় পর সেই শুরুর কথা স্মরণ করে নূর মোহাম্মদ বলেন, “রাজনীতি আমার কাছে তখন থেকেই মানুষের সঙ্গে থাকার একটি পথ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি এলাকার মানুষের কাছে যেতে পারতাম, তাদের কথা শুনতাম- সেখান থেকেই সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি হয়।”
নূর মোহাম্মদের জন্ম ১৯৫৯ সালের ১২ মে, চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার জোবরা সিকদার পাড়া গ্রামে। পড়াশোনায় মেধাবী এই রাজনীতিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৭৮-৭৯ শিক্ষাবর্ষে বি.কম অনার্স এবং ১৯৮২ সালে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণই তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৮০ সালে ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে যাত্রা শুরুর পর নূর মোহাম্মদের সাংগঠনিক পরিসর দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং হাটহাজারী থানা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৮৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত টানা সাত বছর তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
নূর মোহাম্মদ বলেন, “ছাত্ররাজনীতির সময়টা ছিল সংগ্রামের সময়। সংগঠন ধরে রাখা, কর্মীদের পাশে থাকা এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে মাঠে থাকা- এসবই আমাদের প্রতিদিনের কাজ ছিল।”
ছাত্ররাজনীতির অধ্যায় শেষে তিনি প্রবেশ করেন মূলধারার রাজনীতিতে। ১৯৮৭-৮৮ সালে হাটহাজারী থানা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর ১৯৮৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ বছর হাটহাজারী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে সুসংগঠিত করা তাঁর প্রধান কাজের একটি ছিল বলে জানান তিনি।

পরবর্তী সময়ে ২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সাল থেকে তিনি হাটহাজারী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা সম্পর্কে নূর মোহাম্মদ বলেন, “রাজনীতিতে পদ বড় বিষয় নয়; বড় বিষয় হলো কর্মীদের আস্থা ধরে রাখা। আমি সব সময় তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেছি।”
রাজনীতির পাশাপাশি সমবায় ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন নূর মোহাম্মদ। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি হাটহাজারী থানা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম নাজিরহাট সড়ক পরিবহন সমবায় সমিতির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
পরিবহন খাতেও তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম আন্তঃজেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি ১৯৮৬, ১৯৮৯ ও ১৯৯২ সালে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
নূর মোহাম্মদের ভাষায়, “রাজনীতি শুধু দলীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের নানা পেশার মানুষ, শ্রমিক, সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান- সব জায়গাতেই মানুষের স্বার্থ ও সংগঠনের শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন আছে।”

শিক্ষা খাতেও দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত নূর মোহাম্মদ। তিনি জোবরা পি.পি. উচ্চ বিদ্যালয়, জোবরা পশ্চিম পট্টি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, ফতেপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এবং জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া হাটহাজারী আজিজিয়া নোমানিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ভূমিকা রাখেন।
তিনি বলেন, “শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজ এগোতে পারে না। রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে থাকতে পেরেছি- এটা আমার জন্য বড় প্রাপ্তি।”
সামাজিক কর্মকাণ্ডেও নূর মোহাম্মদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হিসাববিজ্ঞান সমিতি, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজকল্যাণ ফেডারেশনের আজীবন সদস্য। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজকল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
চার দশকের বেশি সময় ধরে রাজনীতি, সমবায়, শিক্ষা, শ্রমিক সংগঠন ও সমাজসেবায় যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে নূর মোহাম্মদ বলেন, “আমি সব সময় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। যেখানেই দায়িত্ব পেয়েছি, সেটাকে দায়িত্ব হিসেবেই দেখেছি—পদ বা পরিচয় হিসেবে নয়।”
জোবরা গ্রামের ছাত্রনেতা থেকে জেলা-উপজেলার প্রবীণ সংগঠক- নূর মোহাম্মদের দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে দৃশ্যমান বিষয় হলো ধারাবাহিকতা। ছাত্ররাজনীতির মাঠ, তৃণমূলের দলীয় সংগঠন, সমবায় ব্যবস্থাপনা, পরিবহন খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকল্যাণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থেকেছেন।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতি ও সমাজসেবার পরিসরে নূর মোহাম্মদের এই পথচলা তাই শুধু একজন রাজনীতিকের জীবনবৃত্তান্ত নয়; বরং তৃণমূল থেকে উঠে আসা এক সংগঠকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার গল্প।