
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বটতলী রুস্তমহাট আজ যেন আর শুধু একটি জনপদ নয়; এটি পরিণত হয়েছে ভক্তি, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক আবহের এক বিশাল মিলনমেলায়। প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.)-এর বার্ষিক ওরশ শরিফ ঘিরে শনিবার (২০ জুন) সকাল থেকেই মাজার প্রাঙ্গণে ঢল নেমেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আশেক, ভক্ত ও অনুরাগীদের।
গতকাল থেকেই গাড়ি, মাইক্রোবাস, বাস ও নানা বাহনে করে মানুষ আসতে শুরু করেন বটতলীর রুস্তমহাট এলাকায়। রাত গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাজারের চারপাশে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। আর সকাল হতে না হতেই পুরো এলাকা যেন জিকির, মিলাদ, দরুদ আর মোনাজাতের সুরে ভরে ওঠে। মাজারের আঙিনা থেকে আশপাশের সড়ক—সবখানেই মানুষের স্রোত। কোথাও কেউ জিয়ারতে ব্যস্ত, কোথাও মিলাদে; কেউ দোয়া করছেন নীরবে, কেউবা বহু দূর থেকে এসে দাঁড়িয়ে আছেন প্রিয় আধ্যাত্মিক সাধকের দরবারে।
ওরশকে কেন্দ্র করে শুধু মাজার প্রাঙ্গণ নয়, পুরো আনোয়ারাজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। রাস্তার দুই পাশে দোকানপাট, মেলার পসরা, তবারুকের আয়োজন, ভক্তদের পদচারণা—সব মিলিয়ে বটতলী আজ হয়ে উঠেছে ধর্মীয় আবেগ ও লোকজ সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র।
মাজার পরিচালনা ও ওরশ উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সকাল থেকে শুরু হওয়া মূল আনুষ্ঠানিকতা চলবে গভীর রাত পর্যন্ত। দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে খতমে কোরআন, মিলাদ মাহফিল, জিকির-আজকার, বিশেষ ধর্মীয় আলোচনা, কাওয়ালি ও ভক্তিমূলক গানের আসর। দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় অনুষ্ঠিত হবে আখেরি মোনাজাত। পাশাপাশি লাখো ভক্তের মাঝে বিতরণ করা হবে ঐতিহ্যবাহী তবারুক।
মাজার পরিচালনা কমিটির যুগ্ম মুতাওয়াল্লি এস এম ফজলুল করিম ও এম এম জহিরুল ইসলাম জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও ওরশকে ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভক্তদের আগমন, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, তবারুক বিতরণ ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কমিটির পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন রাখা হয়েছে।
হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.)-কে ঘিরে আনোয়ারার মানুষের ভক্তি ও বিশ্বাস বহু পুরোনো। ঐতিহাসিক তথ্য ও লোকমুখে প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, প্রায় ৭০০ বছর আগে তিনি প্রাচীন আরবের ইয়েমেন অঞ্চল থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে চট্টগ্রামে আগমন করেন। প্রচলিত আছে, তিনি পাথরকে তরী বানিয়ে এ অঞ্চলে আসেন। চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে আরেক প্রখ্যাত সাধক হযরত বদর আউলিয়া (রহ.) ছিলেন তাঁর মামা।
চট্টগ্রামে এসে প্রথমে তিনি শঙ্খ নদীর তীরে আস্তানা স্থাপন করেন। এরপর দীর্ঘকাল ইবাদত-বন্দেগি, মানবসেবা ও ইসলাম প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তাঁর জীবনকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে আজও প্রচলিত আছে নানা অলৌকিক ঘটনার কথা। বলা হয়, এক বোবা রাখাল ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে দেওয়ার পর সে বাকশক্তি ফিরে পায়। আবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর দোয়ার পর বৃষ্টি বর্ষিত হয়ে কৃষকের দুর্দশা লাঘব হয়েছিল বলেও লোকমুখে শোনা যায়।
দীর্ঘ সাধনাময় জীবনের পর এই আধ্যাত্মিক সাধক আনোয়ারা উপজেলার বটতলীতে সমাহিত হন। তাঁর সমাধিকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে আজকের মাজার শরিফ। প্রতি বছর ওরশের দিনে সেই মাজার হয়ে ওঠে লাখো মানুষের মিলনস্থল—যেখানে কেউ আসেন মানত নিয়ে, কেউ কৃতজ্ঞতা জানাতে, কেউবা নিছক ভালোবাসা ও ভক্তির টানে।
ওরশকে ঘিরে রুস্তমহাট এলাকায় বসেছে ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলা। মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সাজিয়ে বসেছেন নানা পসরা। কোথাও তৈজসপত্র, কোথাও বাঁশ-বেতের সামগ্রী, কোথাও মিষ্টির দোকান। শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের ভিড়ে মেলাও পেয়েছে আলাদা প্রাণ। ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি এই মেলা যেন গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও মানুষের মিলনবন্ধনের আরেক নাম হয়ে উঠেছে।
লাখো মানুষের সমাগম নির্বিঘ্ন করতে স্থানীয় প্রশাসন ও মাজার কমিটির পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুনায়েদ চৌধুরী জানান, ওরশ প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় যানজট নিরসন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আনোয়ারা থানা পুলিশের পাশাপাশি অতিরিক্ত জেলা পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশের টিম কাজ করছে।
মাজার কমিটির নিজস্ব শতাধিক স্বেচ্ছাসেবকও পুরো এলাকা তদারকি করছেন। তারা ভক্তদের চলাচল, তবারুক বিতরণ, মাজারে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথসহ বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন।
ওরশ উদযাপন কমিটির যুগ্ম মোতোয়াল্লী এস এম জহিরুল ইসলাম বলেন, “প্রতি বছরের মতো এবারও সব ধরনের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে ওরশ সম্পন্ন করার জন্য আমরা সব প্রস্তুতি রেখেছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভক্তদের সহযোগিতায় উৎসবমুখর পরিবেশে এই আয়োজন সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি।”
দিনভর জিকির, মিলাদ, কাওয়ালি, মোনাজাত আর মানুষের ঢলে আজ বটতলী যেন ভক্তির এক জীবন্ত জনপদ। সময় পাল্টেছে, পথ পাল্টেছে, মানুষের জীবনযাত্রাও বদলেছে; কিন্তু মোহছেন আউলিয়ার দরবারে মানুষের ভালোবাসা ও আস্থার স্রোত এখনো থামেনি। বরং প্রতি বছরের ওরশে সেই স্রোত আরও গভীর হয়ে ফিরে আসে আনোয়ারার মাটিতে।