সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

রেলে হাজার কোটি, তবু চাকা ঘোরে না

দুই দশকে বরাদ্দ বেড়েছে তিনশো গুণ, কিন্তু ট্রেনের গতি আটকে আছে তলানিতেই
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২১ জুন ২০২৬ | ৩:১৮ অপরাহ্ন


একটা ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার পর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে মাঝপথে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। যাত্রীরা জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকেন বাইরে, কেউ কেউ টিকিটের টাকা ফেরতের কথা ভাবেন। এই দৃশ্য বাংলাদেশের রেলপথে নতুন কিছু নয়। বরং এটাই এখন নিয়মিত বাস্তবতা।

অথচ গত দুই দশকে রেলখাতে অর্থের কোনো অভাব ছিল না। ২০০৪-০৫ সালে রেলের বার্ষিক বরাদ্দ ছিল মাত্র ৫০ কোটি টাকা। এখন সেটা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে রেলে ব্যয় হয়েছে সোয়া এক লাখ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু এই বিপুল অর্থ কোথায় গেল? যাত্রীরা কি পেলেন উন্নত সেবা? ট্রেন কি পেল গতি?

উত্তর: না।

লাইন হয়েছে, ট্রেন আসেনি

বিগত সরকারের ১৬ বছরে রেলের মোট ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ ঢালা হয়েছে অবকাঠামো ও লাইন নির্মাণে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯৪৮ কিলোমিটার নতুন রেলপথ তৈরি হয়েছে, ২৮০ কিলোমিটার মিটারগেজকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হয়েছে, পুনর্বাসন করা হয়েছে আরও ১ হাজার ৩০৮ কিলোমিটার লাইন। কাগজে-কলমে বেশ বড় অর্জন।

কিন্তু এই চকচকে নতুন লাইনে চলার মতো পর্যাপ্ত ট্রেন নেই। ইঞ্জিন নেই, কোচ নেই। ফলে বিশাল বিনিয়োগের পথ পড়ে আছে প্রায় ফাঁকা।

সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো পদ্মা সেতু রেললিংক ও দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ। এই দুই প্রকল্পে একসঙ্গে খরচ করা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। সমীক্ষা বলছে, এই দুই রুটে শতাধিক ট্রেন চালানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে চলছে মাত্র ৬টি। কারণ একটাই— ইঞ্জিন ও কোচের সংকট।

হিসাবের খাতায় লাল কালি

রেলওয়ের রোলিং স্টক দপ্তর জানাচ্ছে, দেশে কাগজ-কলমে ২৮০টি যাত্রীবাহী ট্রেন থাকলেও ৭৭টি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে। এতে বছরে রেলের আয় কমছে প্রায় ৫৪০ কোটি টাকা। নতুন রেলপথে পর্যাপ্ত ট্রেন না চলায় গচ্চা যাচ্ছে আরও প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

রেলওয়ের ২৯০টি ইঞ্জিনের ৪৫ শতাংশের আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ এই ইঞ্জিন নিয়েই চলছে ট্রেন। পরিণতি হচ্ছে, প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন সেকশনে চলন্ত অবস্থায় ট্রেন বসে যাচ্ছে। যাত্রা বাতিল হচ্ছে, টিকিটের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে রেলওয়ে প্রতিবছর লোকসান দিচ্ছে প্রায় পৌনে তিন হাজার কোটি টাকা। ১ টাকা আয় করতে সংস্থাটির খরচ হচ্ছে পৌনে তিন টাকা। এই লোকসানের পাহাড়ের ওপর আবার চাপছে বিদেশি ঋণের সুদ ও নতুন অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ। কারণ রেলের উন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই এসেছে বিদেশি ঋণ থেকে।

রাজধানীর চিত্র: চাহিদা তিন লাখ, সুযোগ মাত্র বাইশ হাজারের

ঢাকা থেকে প্রতিদিন পঞ্চাশটির বেশি ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে মোট ২২ থেকে ২৩ হাজার যাত্রী যেতে পারেন। অথচ চাহিদা রয়েছে প্রায় তিন লাখ যাত্রীর। অর্থাৎ চাহিদার সামান্য একটি অংশও পূরণ করতে পারছে না রেলওয়ে।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে এখন যা ট্রেন চলছে, তার তিনগুণ ট্রেন চালানো সম্ভব। শুধু দরকার ইঞ্জিন আর কোচ।

একই করুণ চিত্র পণ্য পরিবহণেও। বিশ্বজুড়ে রেলের আয়ের প্রধান উৎস পণ্য পরিবহণ। বাংলাদেশে প্রায় পৌনে পাঁচ হাজার কিলোমিটার রেলপথে পণ্য পরিবহণ হচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। ২৮০টি যাত্রীবাহী ট্রেনের বিপরীতে মালবাহী ট্রেন চলছে মাত্র ১৩টি।

দুর্নীতির পাটাতন

বুয়েটের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হকের মতে, সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করায় হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রেলের সেবার মান উন্নত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ট্রেনের গতির বিচারে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের তলানিতে।

প্রশ্ন হলো, এই বিপুল অর্থ তাহলে গেল কোথায়?

বিগত ১৬ বছরে দায়িত্ব পালনকারী পাঁচ রেলপথমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকে দুর্নীতির মামলা রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, রেল থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি লুটপাট হয়েছে। একটি উদাহরণই যথেষ্ট: বিশ্বে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে খরচ হয় ২৩ থেকে ৭৬ কোটি টাকা। কিন্তু পদ্মা সেতু রেললিংক ও দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি খরচ দেখানো হয়েছে ১৮০ থেকে ২৩০ কোটি টাকা— বৈশ্বিক গড়ের প্রায় চারগুণ।

রেলের প্রকৌশল দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, বিগত সরকার রাজনৈতিক স্টান্টবাজির অংশ হিসেবে ১৪২টি নতুন ট্রেন চালু করেছিল। কিন্তু সেই একই সময়ে ১১০টি পুরোনো ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুরোনো ট্রেনের ইঞ্জিন-কোচ খুলে নিয়েই চালানো হয় নতুন রুটে। নতুন বোতলে পুরোনো মদ।

পথ কোথায়?

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) প্রকৌশলী ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেছেন সরাসরি কথাটা: দ্রুত নতুন ইঞ্জিন-কোচ কেনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অবকাঠামোর সঙ্গে রোলিং স্টক নিশ্চিত করা হলে রেলে লোকসান নয়, লাভ হবে।

রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলছেন, নতুন সরকার এই সংকট সম্পর্কে সচেতন। ইঞ্জিন ও কোচ কিনে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে। নতুন করে আরও ১০টি জেলাকে রেলনেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রতিশ্রুতি আগেও কম হয়নি। তবে এবারের পরীক্ষা কেবল লাইন বানানোর নয়— লাইনে ট্রেন চালানোরও।

কারণ লাইন থাকলেই রেল চলে না। চলে ইঞ্জিনে, চলে সততায়।