সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ভরসার সেতু এখন ভয়ের কারণ, দুই বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল

এম মাঈন উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ২১ জুন ২০২৬ | ৮:৩৫ অপরাহ্ন


সকালের ব্যস্ত সময়। স্কুলে যাওয়ার তাড়া, বাজারে যাওয়ার তাড়া, কর্মস্থলে পৌঁছানোর তাড়া। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার শাহাজী বাজারের পশ্চিম পাশে ইছাখালী খালের ওপর নির্মিত সেতুটির দিকে এগিয়ে আসে একের পর এক মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ ও পথচারী। কিন্তু সেতুর মাঝখানে পৌঁছাতেই সবার গতি থেমে যায়। চোখে পড়ে পাটাতনের বড় বড় গর্ত। কেউ ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে যায়, কেউ নামিয়ে নেয় যাত্রীদের, আবার কেউ শঙ্কিত চোখে পার হয় ঝুঁকিপূর্ণ অংশটুকু।

এভাবেই প্রায় দুই বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজার হাজার মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুর অবস্থা দিন দিন খারাপ হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো সংস্কারকাজ শুরু হয়নি।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে ইছাখালী খালের ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হয়। এটি শুধু একটি সেতু নয়; ইছাখালী, কাটাছরা ও মিঠানালা ইউনিয়নের বহু মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের প্রধান সংযোগপথ। এই পথ ব্যবহার করে আশপাশের অন্তত ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করেন।

কিন্তু দীর্ঘ ব্যবহারে সেতুর কয়েকটি অংশের পাটাতন ভেঙে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। অনেক সময় ছোট যানবাহন এসব গর্তে আটকে যায়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

মলিয়াইশ এলাকার বাসিন্দা ও সমাজকর্মী মাসুদ রানা সম্প্রতি সেতুটি দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “ব্রিজটির অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সড়ক থেকে ব্রিজের অবস্থান কিছুটা উঁচু হওয়ায় দূর থেকে ভাঙা অংশ দেখা যায় না। নতুন কোনো চালক বুঝে ওঠার আগেই দুর্ঘটনার মুখে পড়তে পারেন। বিষয়টি দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা জরুরি।”

স্থানীয় বাসিন্দা প্রকৌশলী সেলিম উল্লাহ জানান, সেতুটির দুই পাশে বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষের যাতায়াত নির্ভর করে এই একটিমাত্র সংযোগের ওপর।

তার ভাষায়, “পশ্চিম ইছাখালী, লুদ্দাখালী, ছুনি মিঝির টেক, আমিন বাজার, টেকেরহাট, সাগরিকা ও ভাঙোনি এলাকার মানুষ যেমন এই সেতু ব্যবহার করেন, তেমনি পূর্ব পাশে শাহাজী বাজার, পশ্চিম বাড়িয়াখালী, পূর্ব ইছাখালী, ইসলামপুর ও এছাক ড্রাইভার হাট এলাকার বাসিন্দারাও একই পথ ব্যবহার করেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির পানিতে গর্ত ঢেকে গেলে ঝুঁকি বোঝা যায় না। তখন দুর্ঘটনার আশঙ্কা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. দিদারুল আলম বলেন, “সেতুটি পরিদর্শন করা হয়েছে। বিষয়টি সংসদ সদস্যের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আমরা আশা করছি নতুন করে পুরো সেতুর সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের জন্য বরাদ্দ পাওয়া যাবে।”

মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন বলেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার সেতু-কালভার্টের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হবে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বরাদ্দ ও পরিকল্পনার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আর কতদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হবে?

দুই দশক আগে নির্মিত সেতুটি একসময় ছিল জনপদের উন্নয়নের প্রতীক। এখন সেই সেতুর গর্তগুলো যেন প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় অবকাঠামোর বয়স, অবহেলা এবং মানুষের অনিশ্চয়তার গল্প। স্কুলপড়ুয়া শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পথচারী—সবার একটাই প্রত্যাশা, দুর্ঘটনা ঘটার আগেই যেন মেরামত হয় তাদের ভরসার এই সেতু।