
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বাবুছড়া ইউনিয়নের বাঙ্গালা করুনা পাড়া। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ, কোথাও পাকা সড়ক, কোথাও কাঁচা মাটি, আবার কোথাও নদীপথে নৌকা- এতটা পথ পেরিয়েই পৌঁছাতে হয় এই জনপদে। এতটা দুর্গমতার মধ্যে বাস করেও বছরের পর বছর এখানকার মানুষ ভুগছিল এক নিরব কিন্তু তীব্র কষ্টে- সুপেয় পানির অভাব। শুধু সাধারণ বাসিন্দারাই নয়, এই সংকটের শিকার হয়ে আসছিল বাঙ্গালা করুনা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও, দিনের পর দিন।
দীর্ঘদিনের এই কষ্টেরই অবসান ঘটাতে এগিয়ে এলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এলাকাটিতে স্থাপন করা হলো একটি সৌরশক্তিচালিত সাবমার্সিবল টিউবওয়েল, সোমবার (২২ জুন) সকালে যার উদ্বোধন করেন ০৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ‘দি বেবী টাইগার্স’ দীঘিনালা জোনের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আল-আমিন। সূর্যের আলো থেকে শক্তি নিয়ে চলা এই টিউবওয়েল এখন থেকে সারা বছর সরবরাহ করবে নিরাপদ ও সুপেয় পানি- যা শুধু এলাকাবাসীর জন্য নয়, স্কুলের শিশুদের জন্যও বয়ে আনবে নতুন স্বস্তি।
এই উদ্বোধনের পেছনের গল্পটাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। অনুষ্ঠানে এলাকাবাসীর উদ্দেশে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আল-আমিন বলেন, খাগড়াছড়ি রিজিয়নের কমান্ডার নিজে এই এলাকা পরিদর্শন করে বাসিন্দাদের দুর্ভোগের কথা জেনেছিলেন, এবং পানির এই সংকটই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় চাহিদা। তিনি আশ্বস্ত করেন, এই সৌরশক্তিচালিত টিউবওয়েলের মাধ্যমে এলাকাবাসী ও স্কুলের শিশুরা এখন থেকে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা পাবে।
আর কেবল টিউবওয়েল উদ্বোধনেই থেমে থাকেননি জোন অধিনায়ক। অনুষ্ঠান শেষে তিনি স্থানীয়দের সুখ-দুঃখের কথা শোনেন, চিকিৎসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার নানা সমস্যার খোঁজখবর নেন এবং এলাকায় সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান। তারপর তিনি বাঙ্গালা করুনা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় উৎসাহ দেন।
এই সফরে যে বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, তা হলো স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের চিত্র। যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে এখানকার মানুষ চিকিৎসাসহ নানা মৌলিক সুবিধা থেকে এমনিতেই বঞ্চিত থাকে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল সুপেয় পানির অভাব- যার কারণে শিশু থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ, সব বয়সী মানুষের মধ্যে পানিবাহিত নানা রোগ ও স্বাস্থ্য সমস্যা লেগেই থাকত।
ঠিক এই কষ্টের প্রেক্ষাপটেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন সেনাবাহিনীর প্রতি। স্থানীয় ইউপি সদস্য নোবেল চাকমা বলেন, সেনাবাহিনী পাড়ার বাসিন্দা ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করে দেওয়ায় তারা রিজিয়ন কমান্ডার ও জোন অধিনায়কের প্রতি কৃতজ্ঞ।
তার এই কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাবুছড়া ইউপি চেয়ারম্যান গগন বিকাশ চাকমাও বলেন, বাবুছড়া অত্যন্ত দুর্গম ও প্রত্যন্ত একটি এলাকা, যেখানে রিজিয়ন কমান্ডার ও জোন কমান্ডার নিজে এসে মানুষের সমস্যার কথা শুনেছেন। ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষের সবচেয়ে বড় চাহিদা ছিল বিশুদ্ধ পানি, যা তারা পূরণ করে দিয়েছেন- এ জন্য পুরো অঞ্চলের মানুষের পক্ষ থেকে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এই কৃতজ্ঞতা আর স্বস্তির মাঝেও একটা প্রত্যাশা থেকেই যায়। দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট ঘুচিয়ে এই সৌরশক্তিচালিত সাবমার্সিবল টিউবওয়েল দুর্গম পাহাড়ি জনপদে নিয়ে এসেছে নিরাপদ পানির নতুন আশা। তবে শুধু পানি দিয়েই এই জনপদের সব সংকট মেটে না- এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এমন কার্যকর উদ্যোগ আগামীতে অব্যাহত থাকবে, যাতে দুর্গম পাহাড়ের এই জনপদ আর পিছিয়ে না থাকে মৌলিক সুবিধা থেকে।