
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র ৩০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। এই তালিকায় ভোটারের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা ও ভোটার নম্বরসহ একাধিক সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচন উপলক্ষে ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই তালিকা শুধু মনোনীত প্রার্থীদের কাছেই সরবরাহ করা হয়েছিল। সেই তালিকাই এখন প্রকাশ্যে সামাজিক মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ২৮ মে ‘মোহাম্মদ মাজহারুল হাফিজ’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি গ্রুপে আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা ৩০ টাকা এবং সারা দেশের তালিকা ৪০ টাকায় বিক্রির পোস্ট দেওয়া হয়। এরপর ‘মোহাম্মদ আরিফ হোসান’ নামের আরেকটি অ্যাকাউন্ট থেকে নির্বাচন কমিশনের লোগোসহ পোস্ট দিয়ে আসনভিত্তিক তালিকা ৪০ টাকা এবং সারা দেশের তালিকা ৬০ টাকায় বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ ছাড়া ‘নাজিম হোসাইন’ নামের অপর একটি অ্যাকাউন্ট থেকে মুন্সিগঞ্জ জেলার একটি এলাকার ভোটার তালিকার প্রথম পাতার ছবি পোস্ট করে একই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে প্রাসঙ্গিক শব্দ ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালালে ডিসমিসল্যাব এমন ৫০০টির বেশি পোস্ট খুঁজে পায়। অন্তত ১৫টি ভিন্ন ভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে এসব পোস্ট করা হয়েছে। শুধু গ্রুপে পোস্ট করেই নয়, ফেসবুক পেজ থেকে বিজ্ঞাপন চালিয়েও এই তালিকা বিক্রি করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে, গুগল ড্রাইভের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক তালিকা ৯৯ টাকা এবং সারা দেশের তালিকা ২৫০ টাকায় দেওয়া হবে।
অনুসন্ধানের স্বার্থে ডিসমিসল্যাব একটি পেজে যোগাযোগ করে। তারা একটি বিকাশ নম্বরে ২৫০ টাকা পাঠানোর পর গুগল ড্রাইভের একটি লিংক পায়। লিংকে প্রবেশ করে দেখা যায়, আটটি বিভাগের নামে ফোল্ডার তৈরি করে সব আসনের ভোটার তালিকা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পরিচিত কয়েকজনের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ডিসমিসল্যাব নিশ্চিত হয় যে তালিকায় থাকা তথ্যগুলো সম্পূর্ণ সঠিক। ফেসবুকের পাশাপাশি টেলিগ্রামেও বিনা মূল্যে এই তালিকা সরবরাহ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, তাঁরা ভোটার তালিকা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রত্যেক প্রার্থীকে পিডিএফ আকারে প্রদান করেছিলেন, যেখানে ভোটারদের ছবি ছিল না। কোনো প্রার্থী এটি কাউকে দিয়ে বা বিক্রি করে থাকতে পারেন। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে এটি বিক্রির কোনো অনুমতি নেই। মো. রুহুল আমিন মল্লিকের ধারণা, তালিকা ছাপানোর জন্য প্রার্থীরা যখন কোনো কম্পিউটারের দোকানে গেছেন, তখন দোকানদাররা হয়তো এটি কপি করে রেখে দিয়েছেন।
ডিসমিসল্যাব যে বিক্রেতার কাছ থেকে তালিকা সংগ্রহ করেছিল, তিনি দাবি করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই তিনি এটি পেয়েছেন। প্রমাণ হিসেবে তিনি একটি স্ক্রিনশট দিলেও ওই সূত্রটির ফোন নম্বর বর্তমানে বন্ধ পাওয়া যায়।
এই ফাঁসের ফলে তৈরি হওয়া ঝুঁকি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন বলেন, ফাঁস হওয়া তথ্যের সাহায্যে অপরাধীরা ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করে বিভিন্ন পরিষেবা গ্রহণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি এবং কারও অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। অন্যের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে সাইবার অপরাধ সংঘটনেরও শঙ্কা রয়েছে।
নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষায় করণীয় সম্পর্কে অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে, তাদের তথ্য সুরক্ষায়ও নজরদারি এবং বাজেট বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। প্রার্থীদের ভোটার তালিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরো তথ্য না দিয়ে যতটুকু প্রয়োজন শুধু ততটুকু দেওয়া এবং সেটি ব্যবহারে সতর্কতার নির্দেশনা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া তথ্য চুরির সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনারও দাবি জানান এই বিশেষজ্ঞ।