
চট্টগ্রামের জন্য সংখ্যাগুলো একেবারে অপরিচিত নয়, কিন্তু তবুও প্রতিবার নতুন করে ভয় ধরায়। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, গত সাড়ে পাঁচ বছরে এই জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৯ হাজার ১৭৪ জন, প্রাণ হারিয়েছেন ২২৬ জন। এর মধ্যে ২০২৩ সাল ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ, যে বছর চট্টগ্রামে একাই ১৪ হাজার ৮৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মারা গিয়েছিলেন ১০৭ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ জুন পর্যন্ত হিসাবেও জেলায় ১৯৭ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যার মধ্যে মহানগরেই ১২০ জন। এক জনের মৃত্যু হয়েছে এই সময়ে, আর বর্তমানে নয়জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সংখ্যাগুলো এখনও তুলনামূলক কম মনে হতে পারে। কিন্তু এই হিসাব বর্ষা মৌসুম শুরুর আগের, যখন এডিস মশার বংশবিস্তার এখনও পূর্ণমাত্রায় শুরু হয়নি। জুলাই আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি থাকে, এবং বর্ষা শেষ হওয়ার এক দেড় মাস পরও তা বাড়তে পারে। তাই এই মুহূর্তের পরিসংখ্যান দেখে স্বস্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বরং এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় প্রস্তুতি নেওয়ার।
জাতীয় চিত্রটাও স্বস্তিদায়ক নয়
হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইনের পরও হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যু বন্ধ হয়নি। প্রায় নির্মূল হওয়া এই রোগটি চার মাস ধরে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে, যা আমাদের প্রায় অপ্রস্তুত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই ডেঙ্গু সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী চিত্র যারপরনাই উদ্বেগজনক।
প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত দেশের ৫৮টি জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৬৮০ জন, মারা গেছেন ৭ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এই সংখ্যা এরই মধ্যে বেড়ে পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দশের ওপরে। যদিও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম, এতে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। ২০১৯, ২০২২ ও ২০২৩ সালের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কতটা ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
ডেঙ্গু একসময় ঢাকাকেন্দ্রিক ও বর্ষা মৌসুমভিত্তিক রোগ হলেও এখন এটা গোটা দেশ ও সারা বছরের অসুখ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের নিয়মিত বিশ্লেষণ বলছে, এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বরিশাল ও খুলনা বিভাগের জেলাগুলোতে বেশি দেখা যাচ্ছে, তবে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারের মতো জেলাগুলোও সংক্রমণের তালিকায় বরাবরই সামনের দিকে থাকে।
কেন এত প্রচেষ্টার পরও সাফল্য আসছে না
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ডেঙ্গু প্রতিরোধের ওপর জোর দিয়েছে। প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি পরিদর্শন করে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে, নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও চলেছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গরম ও বৃষ্টির ধরন বদলানো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতিপূর্ণ জনবসতি এবং দুর্বল মশকনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, এই সবকিছুই এডিস মশা বিস্তারের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করছে।
জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের তথ্য বলছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ডেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি ছিল, যার মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড চরম ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রামে এ ধরনের ওয়ার্ডভিত্তিক স্বচ্ছ তথ্য কতটা নিয়মিত প্রকাশ করা হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অথচ এই তথ্যই নির্ধারণ করে দিতে পারে কোন এলাকায় কোন সময়ে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জরুরি।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি কমানোর একমাত্র পথ হলো এডিস মশা নিধন ও মশার বংশবিস্তার রোধ। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো মশার বংশবিস্তার রোধ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসের চেয়ে মশা নিধনের ওপর বেশি মনোযোগ ও অর্থ ব্যয় করে। বৈজ্ঞানিকভাবে এই ভুল পদ্ধতির ওপর দাঁড়িয়ে যে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু মোকাবিলা করা যায় না, গত ২৬ বছরের অভিজ্ঞতাই তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের জন্যও এই শিক্ষা সমান প্রযোজ্য। কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ মেনে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে সারা বছর এডিস মশা নির্মূলে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর কর্মসূচি পরিচালনা করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
প্রস্তুতি নিতে হবে আজই
আমরা মনে করি, ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়লে রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা যাতে নিশ্চিত করা যায়, তার জন্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে আগেভাগেই প্রস্তুত করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার স্থাপন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাঠে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ১০ শতাংশ শয্যায় বিনা মূল্যে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে এবং রোগনির্ণয় কেন্দ্রগুলোকে পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ ছাড় দিতে বলা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলার অন্য হাসপাতালগুলোতে এই ব্যবস্থা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা পরিষ্কারভাবে জানা দরকার নগরবাসীর।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়ে গেলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর বড় চাপ তৈরি হয়। উপজেলা ও মফস্সল থেকে রোগীরা মহানগরে চিকিৎসা নিতে আসতে বাধ্য হন, আর চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পরিবারগুলোকে হিমশিম খেতে হয়। ফলে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়া ও নির্দেশ দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়, সেটা যেন বাস্তবায়ন হয়, সেদিকেও মনোযোগ দিতে হবে। চট্টগ্রামের ইতিহাসে ২০২৩ সালের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা যেন আমরা ভুলে না যাই। তখন বর্ষা শুরুর আগে যে সতর্কতা পাওয়া গিয়েছিল, তা যথাসময়ে কাজে লাগানো হয়নি। এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে।
এডিস মশা নির্মূল ও ডেঙ্গু চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আগেভাগে প্রস্তুতি, সমন্বিত উদ্যোগ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। চট্টগ্রামের প্রতিটি ওয়ার্ডে, প্রতিটি মহল্লায় যদি এখনই পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা যায়, তাহলে বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে যে সংকট অপেক্ষা করছে, তা এখনও অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। আমরা যেন আবারও পরিসংখ্যান দেখে আক্ষেপ করার বদলে, আগেভাগেই কাজ করার বুদ্ধিমত্তা দেখাতে পারি।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।