সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ইয়াবার পুরোনো রুটে আইসের নতুন ভয়

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন


চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানা এলাকায় গত বছরের ৮ ডিসেম্বরের একটি ঘটনা এখন মাদকবিরোধী অভিযানের ভেতরের দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। প্রকাশিত পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার থেকে ঢাকার পথে নেওয়া হচ্ছিল এক লাখ ইয়াবা। বাহক হিসেবে অভিযোগ ওঠে একজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে, যিনি কক্সবাজার আদালতে একজন বিচারকের গানম্যান ছিলেন। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরে ধরা পড়ার পরও ইয়াবার চালানটি গায়েব হয়ে যায়, সন্দেহভাজন বাহককে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় মামলা হয়নি। তদন্ত কমিটি কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও মামলা করার সুপারিশ করলেও ইয়াবাগুলো উদ্ধার হয়নি।

এই ঘটনা শুধু একটি চালান হারানোর অভিযোগ নয়; এটি কক্সবাজার–চট্টগ্রাম–ঢাকা মাদক রুটের অন্ধকার দিকও দেখায়। সীমান্ত দিয়ে ঢোকা মাদক প্রথমে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, নাফ নদী, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন ও উপকূলীয় পথে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সড়ক, নদী, সমুদ্রপথ ও ছোট পরিবহন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বড় চালানের একটি অংশ চট্টগ্রামে আসে। চট্টগ্রাম কখনও ট্রানজিট পয়েন্ট, কখনও বাজার, কখনও আবার ঢাকামুখী চালানের মধ্যবর্তী নিরাপদ বিরতি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন–২০২৫ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানের তথ্য একই ছবি তুলে ধরছে—ঢাকা দেশের সবচেয়ে বড় মাদকবাজার হলেও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এখন সেই বাজারের সরবরাহ শৃঙ্খলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই জেলা। ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত বা অবৈধ মাদক ব্যবহারকারী। বড় অংশই ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ। মাদকসেবীদের মধ্যে নারী ও শিশুও আছে। সবচেয়ে বড় বাজার ঢাকা; এরপর কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা বড় ঝুঁকির এলাকায় পরিণত হয়েছে।

চট্টগ্রামের গুরুত্ব বোঝার জন্য সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। চলতি বছরের মার্চে চট্টগ্রাম নগরে বিশেষ অভিযানে ৪৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ; একই অভিযানে প্রায় আড়াই লাখ ইয়াবা জব্দের কথা জানানো হয়। এর মধ্যে পতেঙ্গা পর্যটন এলাকা থেকেই সবচেয়ে বড় চালান—১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি ইয়াবা—উদ্ধার করা হয়। জুনে হাটহাজারীতে র‍্যাবের অভিযানে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামমুখী একটি নোহা মাইক্রোবাস থেকে ১৭ হাজার ৭২৫ ইয়াবা জব্দ হয়। গাড়ির যাত্রী আসনের নিচে বিশেষ কৌশলে বান্ডেল করে মাদক লুকানো ছিল। আটক ব্যক্তি টেকনাফের বাসিন্দা বলে জানায় র‍্যাব।

কক্সবাজারে চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২৮ জুন উখিয়ায় বিজিবি এক লাখ মিয়ানমার-তৈরি ইয়াবাসহ এক ব্যক্তিকে আটক করে। এর আগে ১৬ জুন টেকনাফের হ্নীলার আলীখালী এলাকায় কোস্টগার্ড ১ লাখ ৩০ হাজার ইয়াবা জব্দ করে। মে মাসে টেকনাফে নৌবাহিনীর অভিযানে এক লাখ ইয়াবা ও ৫ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস উদ্ধার হয়; একই অভিযানে অস্ত্রও পাওয়া যায়। এসব ঘটনা দেখায়, সীমান্তের মাদক কারবার আর শুধু ইয়াবা বড়িতে সীমাবদ্ধ নেই; আইস, কেটামিন, এমডিএমএ, এলএসডি, সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েডস, ট্যাপেন্টাডল, বুপ্রেনরফিন ও ‘কুশ’-এর মতো নতুন রাসায়নিক মাদকও ধীরে ধীরে বাজারে ঢুকছে।

ডিএনসির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাকে মূলত তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে—পশ্চিম সীমান্ত, উত্তর সীমান্ত এবং দক্ষিণ-পূর্বের মিয়ানমার সীমান্ত। পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে মূলত ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক ঢোকে। দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ঢোকে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের কারণে বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের ট্রানজিট ও বাজারে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে ১৮ জেলার অন্তত ১০৫টি পয়েন্টকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; বিভিন্ন আলোচনায় সীমান্তের প্রায় ১৫০ পয়েন্ট দিয়ে মাদক প্রবেশের কথাও উঠে এসেছে।

কক্সবাজারের টেকনাফ, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, হ্নীলা, হোয়াইক্যং, উখিয়া, বালুখালী, ঘুমধুম, কুতুপালং ও সেন্টমার্টিনকে মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা সক্রিয় রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই রুটের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য মাদক কারবারিদের সুবিধা দেয়। পাহাড়, নদী, উপকূল, রোহিঙ্গা ক্যাম্পঘেঁষা জনবসতি, মাছধরা নৌকা, ছোট ট্রলার ও স্থানীয় পরিবহন—সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে। এক রুটে চাপ বাড়লে কারবারিরা দ্রুত অন্য রুটে সরে যায়।

চট্টগ্রামের ঝুঁকি আলাদা। এখানে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী নদী, মহাসড়ক, রেলপথ, পর্যটন এলাকা, শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ নগর একসঙ্গে আছে। কক্সবাজার থেকে ঢাকামুখী চালানের জন্য চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক ট্রানজিট। আবার নগরের নিজস্ব বাজারও বড়। পতেঙ্গা, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট, কোতোয়ালি, হালিশহর, কর্ণফুলী, চান্দগাঁও, অক্সিজেন, হাটহাজারী ও সীতাকুণ্ডের মতো এলাকা হয়ে মাদক পরিবহন বা সংরক্ষণের অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠেছে। প্রতিটি চালানের সঙ্গে শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, পরিবহনকারী, অর্থদাতা, আশ্রয়দাতা, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবশালী এবং অর্থপাচার চক্রের সংযোগ থাকার ঝুঁকি থাকে।

ডিএনসির ২০২৫ সালের জব্দের হিসাব পরিস্থিতির মাত্রা বোঝায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওই বছর ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজারের বেশি ইয়াবা বা অ্যামফেটামিন টাইপ স্টিমুল্যান্ট ট্যাবলেট জব্দ করেছে। একই সময়ে ৯৬ হাজার কেজির বেশি গাঁজা, ৩ লাখ ১৯ হাজারের বেশি বোতল ফেনসিডিল এবং প্রায় ৩৩৭ কেজি হেরোইন উদ্ধার হয়েছে। তবে জব্দের পরিমাণ বাড়া সবসময় সাফল্যের একক প্রমাণ নয়। এটি সরবরাহ বাড়ারও ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে ইয়াবা জব্দ ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—বাজার কি আরও বড় হচ্ছে, নাকি নজরদারি আরও কার্যকর হয়েছে?

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা ইউএনওডিসি বলছে, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সিনথেটিক ড্রাগের বাজার ২০২৫ সালে আরও বিস্তৃত হয়েছে। মিয়ানমার এখনও এই অঞ্চলের মেথামফেটামিন উৎপাদনের প্রধান উৎস। মেথামফেটামিন ও কেটামিনের জব্দ নতুন রেকর্ডে পৌঁছেছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং আঞ্চলিক অপরাধ অর্থনীতির বিস্তার বাংলাদেশের কক্সবাজার সীমান্তকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

মাদক কারবারিরাও কৌশল বদলেছে। আগে সীমান্ত থেকে বাহক, বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস বা মাছধরা নৌকা ব্যবহার বেশি দেখা যেত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ, অনলাইন পেমেন্ট, ভুয়া পরিচয়, ডার্ক ওয়েব ও ছোট ছোট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এতে বড় গডফাদাররা আড়ালে থেকে যায়; ধরা পড়ে বাহক, খুচরা বিক্রেতা বা আসক্ত তরুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে চালান ধরা পড়লেও অর্থদাতা ও মূল নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে মামলা, সম্পদ জব্দ, মানি ট্রেইল অনুসন্ধান ও দণ্ড নিশ্চিত করার নজির তুলনামূলক কম।

সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই। মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু জব্দের ছবি ও গ্রেপ্তার দেখালেই বাজার ভাঙে না। কক্সবাজারে চালান ধরার পর সেটি কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল, চট্টগ্রামে কে গ্রহণ করত, ঢাকায় কোন নেটওয়ার্কে সরবরাহ হতো, টাকা কোন মোবাইল ফাইন্যান্স বা ব্যাংকিং চ্যানেলে ঘুরত, কারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতর থেকে সুরক্ষা দিত—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে মাদক রুট অক্ষত থাকে। বাকলিয়ার এক লাখ ইয়াবা গায়েব হওয়ার অভিযোগ তাই কেবল একটি দুর্নীতির ঘটনা নয়; এটি দেখায়, মাদক দমন ব্যবস্থার ভেতরেই জবাবদিহির ফাঁক থাকলে সীমান্তে অভিযান করেও বাজার বন্ধ করা যায় না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিদ্যমান আইন দিয়ে বর্তমান মাদক বিস্তার ও মাদক কারবারিদের কার্যকরভাবে দমন করা কঠিন। সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলছে।

ডিএনসি কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা ছাড়া মাদকের চক্র নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। কিন্তু আইন কঠোর করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সীমান্ত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়, ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা, আর্থিক অনুসন্ধান, দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা এবং চিকিৎসা–পুনর্বাসন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের জন্য আলাদা ঝুঁকি পরিকল্পনা জরুরি। টেকনাফ–উখিয়া–কক্সবাজার উপকূল থেকে চট্টগ্রাম নগর, এরপর ঢাকা—এই সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙতে হলে শুধু সীমান্তে নয়, মহাসড়ক, কর্ণফুলী নদী, বন্দর এলাকা, পরিবহন টার্মিনাল, হোটেল-মোটেল, অনলাইন ডেলিভারি নেটওয়ার্ক এবং নগরের খুচরা বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রতিটি বড় চালানের ক্ষেত্রে ‘সাপ্লাই চেইন ম্যাপিং’ বাধ্যতামূলক করা দরকার—কে পাঠাল, কে বহন করল, কে গ্রহণ করত, টাকা কোথায় গেল, কারা সুরক্ষা দিল।

মাদকের গল্প তাই এখন শুধু অপরাধের গল্প নয়; এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি, ডিজিটাল অপরাধ, অর্থপাচার এবং স্থানীয় ক্ষমতার রাজনীতির গল্প। ঢাকা সবচেয়ে বড় বাজার হলেও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সেই বাজারের দরজা। সেই দরজা বন্ধ না হলে অভিযান চলবে, চালান ধরা পড়বে, বাহক গ্রেপ্তার হবে—কিন্তু মাদকের ব্যবসা নতুন পথ খুঁজে আবার ফিরে আসবে।