সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

রাখাইনে বিমান হামলা, বিকট শব্দে কাঁপছে টেকনাফ সীমান্ত

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২ জুলাই ২০২৬ | ২:৫৪ পূর্বাহ্ন


রাত তখন সোয়া নয়টা। হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে উঠল হ্নীলার হোয়াকিয়াপাড়ার আয়েশা ছিদ্দিকীর বাড়ি। ঘুমন্ত সন্তান চমকে উঠে কান্নায় ভেঙে পড়ল। নাফ নদীর ওপারে তখন জ্বলছে আগুন, ছুটছে বোমার আলোর ঝলক। মিয়ানমারের মংডুতে শুরু হয়েছে নতুন বিমান হামলা।

বুধবার রাতে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী মংডু শহরতলিতে আরাকান আর্মির একাধিক অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করে। হাইন্দাপাড়া ঘাঁটি, তিন মাইল, সিকদারপাড়া, ৫ নম্বর ও ১ নম্বর বিজিপি সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন স্থানে বোমা ফেলা হয়, চালানো হয় গুলি। পাল্টা জবাব দেয় আরাকান আর্মিও। দুই পক্ষের এই সংঘাতের আঁচ এসে পড়ে বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা জনপদে।

সাবরাং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান জানান, রাত ১১টা পর্যন্ত এপার থেকে বিমান হামলার দৃশ্য স্পষ্ট দেখা গেছে। শাহপরীর দ্বীপ, জালিয়াপাড়াসহ নাফ নদীসংলগ্ন বেশ কয়েকটি গ্রামে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে। মানুষ আতঙ্কে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন।

জালিয়াপাড়ার বাসিন্দা দিল মোহাম্মদের আশঙ্কা আরও গভীর। তিনি বলেন, মংডু থেকে বিস্ফোরণের পর আগুনের ঝলকানি নিয়ে বস্তু নাফ নদীর দিকে ছুটে আসছে। এগুলো জালিয়াপাড়ায় এসে পড়লে প্রাণহানি অনিবার্য।

সীমান্ত থেকে তিন কিলোমিটার দূরে কুলালপাড়ার বাসিন্দা মো. সোহেলও রেহাই পাননি এই আতঙ্ক থেকে। তিনি জানান, এত দূরে থেকেও বিকট শব্দ স্পষ্ট শোনা গেছে। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারের হামলার তীব্রতা অনেক বেশি।

টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিমান হামলার তথ্য বিজিবির কাছে রয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ চলছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাহিনী প্রস্তুত। টেকনাফের ইউএনও এস এম মো. অনীক চৌধুরীও জানান, সীমান্তবাসীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং নাফ নদীতে কোস্টগার্ড ও বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছে।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘ ১১ মাস যুদ্ধের পর ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর মংডু, বুচিডং ও রাচিডংসহ রাখাইনের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা দখলে নেয় আরাকান আর্মি। এই দখলকৃত এলাকার সীমান্তজুড়েই রয়েছে বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে আরাকান আর্মির অবস্থানে নতুন করে হামলা শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। একইসঙ্গে তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গেও চলছে আরাকান আর্মির সংঘাত।

নাফ নদীর ওপারে যুদ্ধ থামছে না। আর এপারে প্রতিটি বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভাঙছে শিশুর, বুক কাঁপছে মায়ের। সীমান্তের মানুষ জানে না, এই রাত কখন শেষ হবে।