সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

উন্নয়নের আড়ালে বিষাক্ত হচ্ছে আনোয়ারা

জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ২ জুলাই ২০২৬ | ৮:০৪ অপরাহ্ন


মো. ইদ্রিছের বয়স পঁয়তাল্লিশ। চট্টগ্রামের আনোয়ারার বৈরাগ এলাকায় তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটা। বাপ-দাদার আমল থেকে এই বিলেই আমন চাষ করে চলেছে তাঁর পরিবার। সেই জমিই এখন তাঁর কাছে অচেনা। কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি এসে জমি হয়ে গেছে পোড়া মাটির মতো।

ইদ্রিছ বলেন, “জমিতে নামলে পায়ে ঘা হয়ে যায়। এখন আর কিছু হয় না।” একটি মানুষের জীবিকা, একটি পরিবারের স্বপ্ন- সবই গ্রাস করে নিয়েছে শিল্পায়নের অদৃশ্য বিষ।

ইদ্রিছ একা নন। আনোয়ারার হাজারো মানুষ আজ একই বিষের ভাগীদার।

বিষাক্ত বর্জ্যে ডুবছে ফসলি জমি, মরছে নদীর মাছ

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় গত কয়েক দশকে একে একে গড়ে উঠেছে কোরিয়ান ইপিজেড, কাফকো, সিইউএফএল, কর্ণফুলী ড্রাই ডক, চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সাদ মুছার মতো বড় বড় শিল্পকারখানা। এই শিল্পায়ন বদলে দিয়েছে স্থানীয় অর্থনীতির চেহারা। কিন্তু সেই বদলের আড়ালে চুপিসারে ঘটে চলেছে এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়।

কাফকো ও সিইউএফএলসহ রাসায়নিক সার কারখানাগুলোর গ্যাস ও বর্জ্য প্রতিনিয়ত দূষিত করছে এলাকার বাতাস ও জলাশয়। চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ডাইং কারখানার কেমিক্যালযুক্ত তরল বর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে ফসলি জমি ও খালে। ফলে উর্বর জমি হচ্ছে অনাবাদী, খাল-বিলের মাছ মরে ভাসছে পানির ওপর। কর্ণফুলী ড্রাই ডকের কারণে নষ্ট হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ।

এর সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এলাকার ভারী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। পরিবেশ অধিদপ্তরের লাল তালিকাভুক্ত এসব কেন্দ্রের ফার্নেস অয়েল ও তরল বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে বিষাক্ত সালফার ও কার্বন কণা ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে, মাটিতে, পানিতে- নীরবে গ্রাস করছে পুরো জনপদকে।

ঘরে ঘরে শ্বাসকষ্ট, শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই আক্রান্ত

পরিবেশের এই বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের শরীরে। আনোয়ারার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরলে এখন একটাই ছবি চোখে পড়ে- ঘরে ঘরে রোগী। শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, ফুসফুসের সংক্রমণ এখন এই এলাকার নিত্যসঙ্গী।

আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত কয়েক বছরে শ্বাসকষ্ট, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও নানা ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ভুগছেন। বাতাসে সালফার ও নাইট্রোজেনের মতো ক্ষতিকর উপাদান বেড়ে যাওয়াই এর মূল কারণ বলে মনে করেন তিনি।

পরিবেশবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সঠিক পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ ছাড়া একের পর এক ভারী শিল্প স্থাপন এবং পাহাড় কেটে গাছ নিধন করায় আনোয়ারার মাইক্রো-ক্লাইমেট বদলে গেছে। বর্জ্য শোধনাগার শতভাগ কার্যকর না করলে আগামীতে এই বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

সবুজ পাহাড় উজাড়, রুক্ষ হয়ে উঠছে আনোয়ারার প্রকৃতি

একসময় সবুজে ঢাকা ছিল আনোয়ারার পাহাড় ও বনাঞ্চল। কেইপিজেড ও চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিশাল এলাকা জুড়ে ছিল ঘন গাছপালা। কিন্তু কারখানা ও আবাসন গড়ে তুলতে গিয়ে নির্বিচারে কেটে ফেলা হয়েছে সেই সব গাছ। ধ্বংস হয়েছে পাহাড়ের পর পাহাড়।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের স্থানীয় প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শিল্পায়নের নামে আনোয়ারার সবুজ ফুসফুসকে কেটে ফেলা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে এলাকার জীববৈচিত্র্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আনোয়ারা একদিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা আন্তর্জাতিক মানের ইটিপি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব নীতি মেনে চলছে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার গাছ রোপণ করছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চল পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, নিয়মিত মনিটরিং চলছে এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমানকে একাধিকবার হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা ও ফোন করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

আনোয়ারার মানুষ শুধু আশ্বাস চান না। তাঁরা চান কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ ইদ্রিছের মতো কৃষকের পোড়া জমি আর রোগাক্রান্ত শিশুর কাশির শব্দ- এই দুটো মিলিয়েই এখন আনোয়ারার বাস্তবতা। উন্নয়নের নামে এই ক্ষত আর কতদিন বহন করবে এই জনপদ?