
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) উদ্যোগে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য গ্রাম আদালত বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহান। একই সঙ্গে গ্রাম আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
শনিবার সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে ‘গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ ও টেকসইকরণে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা ও করণীয়’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা জানান।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং ‘বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ—৩য় পর্যায়’ প্রকল্পের যৌথ আয়োজনে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের জাতীয় প্রকল্প পরিচালক সুরাইয়া আখতার জাহান বলেন, গ্রাম আদালতের মূল উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক ও স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধগুলো দ্রুত, সহজে এবং স্বল্প খরচে নিষ্পত্তির মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা। এই আদালতকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকারের একটি পৃথক বাজেট কোড তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি কর্মমূল্যায়নেও এখন গ্রাম আদালতের কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা নিয়মিত গ্রাম আদালতের শুনানি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন এবং মাঠপর্যায়ে এই তদারকিতে ‘বিট পুলিশ’ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক তুলে দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রতীক ছাড়া নির্বাচনের সিদ্ধান্তের ফলে জনপ্রতিনিধিদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি নতুন করে তৈরি হয়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। তিনি বলেন, গ্রাম আদালত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তাই প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। উচ্চ আদালতের মামলার চাপ কমাতে গ্রাম আদালত বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মত দেন। বিচারকার্য পরিচালনাকারীদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক নির্ধারণ এবং উচ্চ আদালতে যাওয়ার আগে ইউএনও কার্যালয়ে একটি ‘চেকলিস্ট’ রাখার বিষয়েও তিনি সুপারিশ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের একটি বড় পার্থক্য হলো, সেখানে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী, আর আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একটি ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ব্যক্তিনির্ভরতা কমিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রান্তিক মানুষের দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে গ্রাম আদালত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন ও সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (উপসচিব) গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান।
মতবিনিময় সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক মনোয়ারা বেগম, যুগ্ম সচিব রোকসানা খান, উপসচিব (আইন-১) ড. শাহেদ মোস্তফা, চট্টগ্রামের জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ সুব্রত দাশ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার সহকারী কমিশনার এস এম আমিরুল মোস্তফা, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবুল বাসার, বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক শাহীন আকতার এবং গ্রাম আদালত প্রকল্পের বাস্তবায়ন সহযোগী সংস্থা ইপসার পরিচালক নাছিম বানু। এছাড়া চট্টগ্রামের সকল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিনিধি, যুব প্রতিনিধি ও প্রকল্পের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।