
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ থেকে নিম্নচাপ এবং এর প্রভাবে টানা অতিবৃষ্টির কারণে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে চট্টগ্রাম। ওরোগ্রাফিক প্রভাবে সৃষ্ট এই অস্বাভাবিক বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক এবং আবহাওয়া ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল পলাশ এই বিরল বন্যার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) পর্বতমালার বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিওসি) এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী নদীর পানি ও বৃষ্টিপাতের এই ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, মাত্র পাঁচ দিনে চট্টগ্রাম জেলায় ১১৩২ মিলিমিটার, বান্দরবানে ৭০৯ মিলিমিটার এবং বান্দরবানের লামা উপজেলায় ৮৬০ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ মোস্তফা কামাল পলাশ আরও জানান, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বান্দরবানের মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদ, নোয়াখালীর ডাকাতিয়া নদী, হবিগঞ্জের খোয়াই নদ, মৌলভীবাজারের মনু নদ এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের কুশিয়ারা, সুরমা ও মেঘনা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদী এবং তিস্তা নদীর নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে।
চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালী উপজেলা। এর মধ্যে সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত। পানি ঢুকেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আদালত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয়, পৌরসভা কার্যালয় ও থানায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপরিচালক আপ্রু মারমা জানান, জেলায় ৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর আউশ আবাদ, ৫৬৫ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ৪ হাজার ১৬৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়েছে।
বাঁশখালীতে বন্যার পানিতে পাঁচ শতাধিক মাটির ঘর ভেঙে গেছে। ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মিনহাজুল ইসলাম জানান, পুইছড়ি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, উদ্ধারকারী দল বৈলছড়ি এলাকা থেকে একটি পরিবারের সাত সদস্যকে নিরাপদ স্থানে সরিয়েছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ডলু নদীর ঢলে পৌরসভার রামপুর এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বুড়ির দোকান এলাকা, বাজালিয়া অলি আহমেদ বীর বিক্রম কলেজের সামনে এবং দস্তিদারহাটের পূর্ব পাশে সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পাহাড়ি ঢলে শঙ্খ নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। চন্দনাইশের হাশিমপুর এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে পানিবদ্ধতার কারণে যানজট সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, জেলার প্রতিটি উপজেলায় ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
বন্যার কারণে ভূ-গর্ভস্থ জলাধারের পানি দূষিত হওয়ায় চট্টগ্রাম ওয়াসার পক্ষ থেকে নগরবাসীকে রিজার্ভার জীবাণুমুক্ত করে পানি ফুটিয়ে খাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ওয়াসার মড-১ (ফোন: ০১৩২৪-৭১২৪৩১), মড-২ (ফোন: ০১৩২৪-৭১২৪৩২), মড-৩ (ফোন : ০১৩২৪-৭১২৪১১) এবং মড-৪ (ফোন: ০১৩২৪-৭১২৪২৪) বিভাগ এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করবে।
অন্যদিকে, রাজধানীর মিরপুরে সরকারি বাঙলা কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসন ও বিএনপির নেতাকর্মীদের দুর্গতদের পাশে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা সহায়তা এবং আড়াই হাজার মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়েছে।
গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ আগামী ১৪ জুলাই পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছেন। জাতীয় সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী জানিয়েছেন, পাহাড়ধসে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। মং হাই সিং মারমার তোলা একটি ছবিতে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের আমতলী এলাকায় পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোস্তফা কামাল পলাশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীসহ প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।