
পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেটগুলো ইজারা নিয়ে মৎস্য চাষের কারণে জলকপাট বন্ধ রাখায় কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের চাপে প্রশাসন তাৎক্ষণিক জলকপাট খুলতে পারেনি। এতে পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টির পানি নামতে না পারায় তিন উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। পানির তোড়ে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে।
টানা ছয় দিনের ভারী বৃষ্টির পর শনিবার সকাল থেকে বৃষ্টি কমে আসায় মাতামুহুরী নদীতে পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
সড়ক তলিয়ে ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রান্না করতে না পারায় অনেক পরিবার পুরোপুরি শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছানোও কঠিন হচ্ছে।
বর্তমানে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ২৫টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার অন্তত দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। চকরিয়া উপজেলার কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, চিরিঙ্গা, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী প্লাবিত হয়েছে।
পেকুয়া পৌরসভা এবং উপজেলার মেহেরনামা, উজানটিয়া, মগনামা, রাজাখালী, টৈটং, শিলখালী ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি। অপরদিকে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল, বদরখালী, কোণাখালী, ঢেমুশিয়া, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা ও বিএমচর ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষও বন্যাকবলিত।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ শাখা তিন উপজেলার জন্য ১২০ মেট্রিক টন চাল ও ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়ায় ৫০ টন চাল ও আড়াই লাখ টাকা, পেকুয়ায় ৪০ টন চাল ও ২ লাখ টাকা এবং মাতামুহুরীতে ৩০ টন চাল ও ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
শনিবার সকালে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আ. মান্নান দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি হেঁটে ও নৌকায় করে মানুষের খোঁজখবর নেন এবং শুকনো খাবার, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করেন।
এ সময় চকরিয়া ও মাতামুহুরীর ইউএনও শাহীন দেলোয়ার, পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলামসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে জনপ্রতিনিধি ও দুর্গতদের অভিযোগ, প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি। প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো শুকনো খাবার ও খিচুড়ি বিতরণ করছে।
বন্যাদুর্গত এলাকায় পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে ৫৪টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। চকরিয়া উপজেলা সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. জায়নুল আবেদিন জানান, চকরিয়ায় ৩৩টি এবং মাতামুহুরীতে ২১টি টিম কাজ করছে।
এসব টিমে উপসহকারী ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী ও ইউএইচসিপিরা রয়েছেন। গুরুতর জখম বা সাপে কাটার চিকিৎসার জন্য চকরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে র্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে বলেও ডা. জায়নুল আবেদিন জানান।
পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলাম জানান, পানি কমতে শুরু করায় পানিবন্দি মানুষদের খাবার ও ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরীর ইউএনও শাহীন দেলোয়ার জানান, জেলা প্রশাসকের পরিদর্শনের পর আরও পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রসহ বানভাসি মানুষদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।