সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ওসি মনিরের একের পর এক কাণ্ডের পর নড়ল কক্সবাজার জেলা পুলিশ

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১২ জুলাই ২০২৬ | ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন


গত ৮ জুন রাতের কথা। কক্সবাজারের চকরিয়ার মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নে এক প্রবাসীর বাড়িতে ডাকাত দল হানা দেয়। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মা ও মেয়েকে পাশবিক নির্যাতন করা হয়। তারপর ১৪ জুন নিখোঁজ হয় সাত বছরের শিশু ওয়াহিদুল ইসলাম। দুদিন পর খাল থেকে উঠে আসে তার নিথর দেহ। অপহরণের পর বলাৎকার করে হত্যার অভিযোগ ওঠে। আর এত কিছুর মাঝেই চকরিয়া থানার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ পায় ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর ছবি ও পরিচয়।

একটি থানায় এতগুলো ঘটনা, অথচ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছিলেন। অবশেষে নড়ল কক্সবাজার জেলা পুলিশ।

একের পর এক ব্যর্থতার দায়ে সরানো হলো ওসিকে

৭ জুলাই কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপারের এক আদেশে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনির হোসেনকে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়, কক্সবাজারে সংযুক্ত করা হয়। চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার অভিজিত দাস বিষয়টি একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন।

ওসি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকাটা দীর্ঘ। ডাকাতি ও মা-মেয়েকে পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা। শিশু ওয়াহিদুলকে অপহরণের পর বলাৎকার করে হত্যার ঘটনায় নিষ্ক্রিয়তা। চকরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ডাকাতি।

এর বাইরে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, জমি-বিরোধে পক্ষপাতিত্ব, গত মে মাসে এক ব্যক্তিকে পুলিশ সদস্যের পেটানোর ঘটনায় নেপথ্য ভূমিকার অভিযোগ।

আর সবচেয়ে সংবেদনশীল অভিযোগটি হলো- ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীকে উদ্ধারের পর তার ছবি ও পরিচয় থানার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা, যা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন এবং ভুক্তভোগীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

উল্লেখ্য, মাত্র সাত মাস আগে ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর লটারির মাধ্যমে আনোয়ারা থানা থেকে চকরিয়ায় পদায়ন করা হয়েছিল মনির হোসেনকে। আনোয়ারা থানার ওসি থাকাকালীন ২০২৫ সালের অক্টোবরে পিটিয়ে মানুষ হত্যার এক সপ্তাহ পরও তিনি মামলা নেননি। একুশে পত্রিকার প্রতিবেদনের কারণে পরে তিনি মামলা রেকর্ড করতে বাধ্য হন। এই ঘটনার জের ধরে তিনি একুশে পত্রিকার আনোয়ারা-কর্ণফুলী জিন্নাত আয়ুবকে থানার অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে ‘রিমুভ’ করে দিয়েছিলেন।

নতুন ওসির প্রতিশ্রুতি, প্রশাসনের জিরো টলারেন্স

মনির হোসেনের জায়গায় ৯ জুলাই দায়িত্ব নিয়েছেন কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থানার সাবেক ওসি পুলিশ পরিদর্শক আরিফুর রহমান। দায়িত্ব নিয়েই তিনি স্পষ্ট করেছেন লক্ষ্য- চকরিয়া থানাকে দালালি, তদবির বাণিজ্য ও দুর্নীতিমুক্ত রাখা। সাধারণ মানুষ যাতে ভয়হীনভাবে, কোনো হয়রানি ছাড়াই আইনি সেবা পায়, তা নিশ্চিত করার কথাও জানান তিনি।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুলিশের ভাবমূর্তি রক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে। চকরিয়ার এই রদবদল সেই নীতিরই অংশ।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— মা-মেয়ে নির্যাতিত হলেন, সাত বছরের শিশু খুন হলো, ধর্ষিতার পরিচয় ফাঁস হলো, তারপর কেটে গেল কয়েক সপ্তাহ। ব্যবস্থা এলো এক মাস পর। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায়বিচার কতটুকু নিশ্চিত হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

চট্টগ্রাম আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট সালাউদ্দীন আহমদ চৌধুরী লিপু বলেন, “প্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় শুধু বদলি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আনোয়ারা থানায় থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অপেশাদারিত্বের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। এক স্টেশনের বিতর্ক কাটিয়ে অন্য স্টেশনে গিয়েও যদি একই চরিত্র দেখা যায়, তবে শুধু বদলি নয়— আনোয়ারা ও চকরিয়া উভয় স্থানে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের সুষ্ঠু বিভাগীয় তদন্ত হওয়া জরুরি। জবাবদিহি ছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা অসম্ভব।”