
টানা সাত দিনের বৃষ্টি শেষে কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় পানি কমতে শুরু করলেও ভেসে উঠছে বন্যার ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন।
একই সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় পানিবন্দি লাখো মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট চরমে পৌঁছেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার সকালে বন্যাদুর্গত এসব জনপদে মিষ্টি রোদের দেখা মিলেছে।
বৃষ্টি থেমে মাতামুহুরী নদীর পাহাড়ি ঢলের পানি কমে এলেও লোকালয়ের গ্রামগুলোতে তলিয়ে গেছে নলকূপ ও শৌচাগার।
এর ফলে দুর্গত এলাকায় তীব্র বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও স্যানিটেশন সংকট দেখা দিয়েছে।
বেশিরভাগ দুর্গত পরিবার শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করলেও চকরিয়া উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছায়নি।
ঢলের পানিতে রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে নৌকাই এখন যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম।
দ্রুত সময়ে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না গেলে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বানভাসি মানুষ।
কাকারা, বরইতলী, রসুলাবাদ, ডেইঙ্গাকাটা, বিবিরখীল ও হারবাং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছায়নি।
চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান জানান, তার ইউনিয়নের বেশিরভাগ পরিবারের ঘরে এখনো পানি রয়েছে।
নলকূপ ও শৌচাগার তলিয়ে থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকটে মানুষ খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন এবং তাদের দ্রুত শুকনো খাবার ও ত্রাণ প্রয়োজন।
কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন জানান, বানভাসি পরিবারগুলোর হাতে টাকা না থাকায় তারা পণ্য কিনতে পারছেন না।
এ অবস্থায় বেশিরভাগ পরিবার অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে এবং দ্রুত ত্রাণ না এলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বন্যায় শিক্ষার্থীদের বই-খাতা, স্কুলব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণ পানিতে ভেসে গেছে।
বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার জানায়, সামনে পরীক্ষা থাকলেও তার সব বই-খাতা নষ্ট হয়ে গেছে।
মাতামুহুরী উপজেলার একাধিক ইউপি চেয়ারম্যানের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দায়ী।
কিছু স্লুইসগেট ইজারা নিয়ে প্রভাবশালীরা মাছ চাষ করায় বন্যার সময়ও সময়মতো গেট খোলা হয় না।
পশ্চিম বড়ভেওলা ইউনিয়নের বাসিন্দা এডভোকেট রবিউল এহেছান বলেন, সময়মতো স্লুইসগেটের জলকপাট খুললে মানুষের দুর্ভোগ অনেক কম হতো।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানান, বান্দরবানের পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
নদীর পানির উচ্চতা বেশি থাকায় স্লুইসগেট খুললেও পানি বের হওয়ার সুযোগ ছিল না এবং পানি কমে গেলে দ্রুত নিষ্কাশন ও বেড়িবাঁধ সংস্কারের ব্যবস্থা করা হবে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্দশা লাঘবে উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত রয়েছে।
ধাপে ধাপে উপজেলার বিভিন্ন প্লাবিত পানিবন্দি পরিবারের মাঝে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা শাহীন দেলোয়ার জানান, দুর্গম এলাকায় নৌকার মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করে জমা দেওয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বলা হয়েছে এবং কোনো পরিবার সহায়তার বাইরে থাকবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান জানান, জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
দুর্গত এলাকার বানবাসি মানুষের জন্য সরকারিভাবে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।