সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

আট বছরে যা হয়নি, তিন বছরে কি হবে?

বিশেষ সম্পাদকীয়
নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ২০ জুলাই ২০২৬ | ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন


চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালের আইসিইউতে সেদিন তৃতীয় রাত পার করছিল সদ্যোজাত এক শিশু। রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়েছে তিন দিন আগে। চিকিৎসকেরা একের পর এক অ্যান্টিবায়োটিক বদলাচ্ছেন—প্রথম সারির ওষুধ কাজ করছে না, দ্বিতীয় সারিরও না। শেষমেশ যে ওষুধে সাড়া মিলল, সেটি ব্যয়বহুল, আমদানিনির্ভর, আর সব হাসপাতালে সবসময় মজুতও থাকে না।

এই দৃশ্য এখন আর বিরল কিছু নয়। দেশের হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণজনিত মৃত্যুর হার গত কয়েক বছরে প্রায় ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, কারণ রোগীর শরীরে বাসা বাঁধা জীবাণুর একটা বড় অংশ এখন সর্বশেষ সারির অ্যান্টিবায়োটিককেও প্রতিরোধ করতে শিখে গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে—নবজাতকদের শরীরেও এখন অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর উপস্থিতি ধরা পড়ছে, যা সাধারণ সংক্রমণকেও প্রাণঘাতী করে তুলছে।

এই সংকট মোকাবিলার জন্য সময় বাড়তি পাওয়া গেছে, অন্তত ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে। যে ‘২৪ নভেম্বর ২০২৬’ তারিখটি এত দিন এলডিসি উত্তরণের চূড়ান্ত সময় হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছিল, তা আর ঘটছে না। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের কাছে উত্তরণ-প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করে, এপ্রিলে সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ মহাসচিবকে চিঠিও দেওয়া হয়। জুনে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এই আবেদনের পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান জানায়—অর্থাৎ প্রস্তুতিকাল বেড়ে দাঁড়াতে পারে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত।

এই মাসের মাঝামাঝিও জাতিসংঘের ইকোসক অধিবেশনে বাংলাদেশ এই আহ্বান আবার তুলে ধরেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো বাকি—সেটি নেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, ভোটের মাধ্যমে। সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, মালদ্বীপ ও নেপালের ক্ষেত্রে অতীতে এমন সময় বাড়ানোর নজির থাকায় বাংলাদেশের আবেদন গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই রেহাই স্বস্তির খবর, বিশেষত ওষুধশিল্পের জন্য। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এখনো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তির আওতায় পেটেন্ট-ছাড়ের সুবিধা পায়, যার বদৌলতে দেশীয় কোম্পানিগুলো লাইসেন্স বা রয়্যালটি ছাড়াই পেটেন্টকৃত ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ বানাতে পারে। উত্তরণ পিছিয়ে ২০২৯ সালে গেলে এই সুবিধাও আরও তিন বছর বহাল থাকবে। দেশে উৎপাদিত ওষুধের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অন্যত্র পেটেন্টের আওতাভুক্ত; সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, এই ছাড় উঠে গেলে এসব ওষুধের দাম ৩০ থেকে ৪০ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে, আর ব্যাপক ব্যবহৃত ইনসুলিনের দাম বাড়তে পারে ১০-১১ গুণ। প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি তিন বছর দিয়ে আমরা কী করব।

কারণ এবারই প্রথম নয়। বাংলাদেশ ২০১৮ সালেই জাতিসংঘের তিনটি মানদণ্ডের প্রথম মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হয়েছিল। তখন থেকে ধরলে প্রস্তুতির জন্য হাতে ছিল আট বছর। এই আট বছরে ওষুধশিল্পের সংগঠনগুলো সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছে, দাবিদাওয়া তুলেছে—কিন্তু সক্ষমতা তৈরির কাজ যতটা এগোনোর কথা ছিল, ততটা এগোয়নি। নতুন করে পাওয়া তিন বছর যদি একই রকম আলোচনা আর দাবিতেই কেটে যায়, ২০২৯ সালেও আমরা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকব।

আর দুটি ঘড়ি এই কূটনৈতিক আলোচনার অপেক্ষায় নেই। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত বলে ধরা হয়, আর ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বছরে এক কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারী সংক্রমণের বোঝা, অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার আর ওষুধের কাঁচামালের জন্য প্রায় সম্পূর্ণ আমদাননির্ভরতা নিয়ে বাংলাদেশ এই তালিকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। একই সঙ্গে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত নেমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে সর্বনিম্নের কাতারে। প্রতিবেশী নেপাল কর হিসেবে তোলে জিডিপির প্রায় ১৮ শতাংশ, ভারত ১২ শতাংশের বেশি। রাজস্ব যত কম, প্রযুক্তি ও গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সামর্থ্যও তত কম।

এখানে একটি তুলনা কাজে লাগতে পারে। ওষুধশিল্পের কাঁচামাল—অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট বা এপিআই—উৎপাদনে চীন ও ভারত আজ বিশ্বনেতা। দুই দেশের পথ এক ছিল না, তবে কিছু জায়গায় মিলে যায়: শুরুতে শিথিল পেটেন্ট আইনের সুযোগে দক্ষতা অর্জন, তারপর রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, করছাড় ও গবেষণা-অনুদানের মাধ্যমে সেই দক্ষতাকে শিল্পে রূপান্তর। চীন তার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ওষুধ-স্বনির্ভরতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, প্রবাসী বিজ্ঞানীদের ফিরিয়ে এনেছে, রপ্তানিকারকদের ভ্যাট-ফেরত ও করছাড় দিয়েছে। ভারত ২০২০ সালে চালু করা প্রোডাকশন-লিংকড ইনসেনটিভ প্রকল্পের অধীনে এপিআই উৎপাদনে সরাসরি আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে, শিল্প-অবকাঠামোর মর্যাদা দিচ্ছে, বিদ্যুৎ-পানির খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। ফলাফল স্পষ্ট: চীন একাই এখন বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ এপিআই রপ্তানি করে।

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ছবিটা উল্টো। টাকার বিনিময় হার দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দেখানো হচ্ছে—আইএমএফের হিসাবে প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি—যা রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়িয়ে প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমেডিয়ারিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ২০১৮ সাল থেকেই সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে—ঠিক যে বছর থেকে গোনা হচ্ছে উত্তরণ-প্রস্তুতির আট বছর—কিন্তু দৃশ্যমান করছাড়, ভর্তুকি বা প্রশাসনিক সুবিধা এখনো আসেনি।

রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা দিয়ে সাময়িক স্বস্তি মেলে, কিন্তু সেই প্রণোদনার সুফল শেষ পর্যন্ত বিদেশি ক্রেতার হাতেই চলে যায়—ক্রেতারা জানেন প্রণোদনার কথা, তাই দরকষাকষিতে প্রায় সমপরিমাণ ছাড় তাঁরা আদায় করে নেন। উপরন্তু উত্তরণের পর রপ্তানিনির্ভর নগদ ভর্তুকি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা তাই ভর্তুকি দিয়ে কেনা যাবে না; গড়ে তুলতে হবে গবেষণাগারে—যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা আর শিল্পের বাস্তব অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কাজ করবে, আর রাষ্ট্র নেবে সেই প্রাথমিক ঝুঁকি, যা একা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়।

জ্ঞান এমন এক সম্পদ, খরচ করলে যা ফুরায় না; বরং একবার তৈরি হলে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা অর্থনীতিতে, চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে। তিন বছরের এই বাড়তি সময় একটা দ্বিতীয় সুযোগ—প্রথমটির মতো যদি এটিও নীতিনির্ধারকদের সেমিনার-কক্ষে আর শিল্পমালিকদের চিঠি চালাচালিতেই কেটে যায়, তাহলে ২০২৯ সালেও আমরা সেই একই আইসিইউ শয্যার সামনে গিয়ে দাঁড়াব, যেখানে একটি নবজাতকের জীবন নির্ভর করবে এমন একটি ওষুধের ওপর, যা আমরা তখনো নিজেরা বানাতে শিখিনি।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।