আর মাত্র একটা মাস। তারপরই গাছ থেকে পেঁপে নামিয়ে বাজারে নিয়ে যাওয়ার পালা। আট মাস ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা বাগান- ১৩০০ চারা, দুই কানি জমি, আর অসংখ্য রাতের ঘুম হারানো পরিশ্রম। নুরুল আবছার বাদশার মাথায় তখন শুধু একটাই হিসাব ঘুরছিল, পেঁপে বিক্রির টাকায় সংসারের ঋণ শোধ হবে, আবার নতুন করে শুরু করা যাবে।
কিন্তু ৫ জুলাইয়ের বৃষ্টি সেই স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে গেল। মাতামুহুরীর পাহাড়ি ঢলে বাগান তলিয়ে গেল। এক সপ্তাহ পর পানি নামতেই দেখলেন- ৯০ শতাংশ গাছ মরে গেছে। ফলে ভরা থোকায় থোকায় পেঁপে, কিন্তু গাছ নিথর।
বাদশা বললেন, “মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আমার স্বপ্ন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।”
পেঁপে থেকে শসা, সব গেছে- ক্ষতি ২০ লাখ টাকা
চকরিয়া পৌরসভার মৌলভীরচর এলাকার কৃষক নুরুল আবছার বাদশা শুধু পেঁপে চাষ করেননি। পেঁপের পাশাপাশি দুই কানি জমিতে বেগুন, দুই কানিতে শসা, আড়াই কানিতে তিত করলা আর দেড় কানিতে কলাগাছও ছিল। একটির পর একটি সবজি ক্ষেত- সবই ডুবেছে বন্যায়, সব মরেছে।
মোট ক্ষতির হিসাব কষলেন নিজেই- কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা। চলতি মৌসুমে পেঁপের দামও ছিল ভালো। প্রতি কেজি পাকা পেঁপে পাইকারিতে ২৫ থেকে ৩৫ টাকা। প্রতিটি গাছে তিন থেকে চারশো টাকা খরচে আট থেকে হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। সেই হিসাবটা এখন শুধুই কাগজে।
বাদশা বলেন, “চকরিয়া উপজেলার মধ্যে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছি আমি। পুনরায় চাষাবাদ শুরু করতে সরকারের প্রণোদনা সহযোগিতা চাই।”
চকরিয়ায় ১৩ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত
বাদশার গল্প একটি বাগানের নয়, পুরো চকরিয়ার। কৃষি বর্গাচাষী সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন পুতু জানান, এই বন্যায় চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৩ হাজার ৮৫২ জন কৃষকের ফসলের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। কোটি টাকার ক্ষতি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়- এই মৌসুমে পেঁপে, করলা, বেগুন, শসায় বাম্পার ফলন এসেছিল এবং দামও ছিল ভালো। ঠিক সেই মুহূর্তে বন্যা এসে সব শেষ করে দিল।
চকরিয়া পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি অফিসার আবুল বশর জানান, বাদশার ক্ষতির বিষয়টি জরিপে রেকর্ড করা হয়েছে। পুরো পৌরসভার ক্ষয়ক্ষতির তালিকা উপজেলা কৃষি বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, মাঠপর্যায় থেকে ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কৃষি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
বাদশার বাগানে এখনো কিছু গাছ দাঁড়িয়ে আছে। মরা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আট মাসের পরিশ্রম, ঋণের টাকা, স্বপ্নের হিসাব- সব এখন বন্যার কাদায় মেশা। সরকারি প্রণোদনার আশ্বাস এসেছে, কিন্তু মৌলভীরচরের মাঠে যে শূন্যতা, সেটা পূরণ হতে অনেক সময় লাগবে।