সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

চার মাসে হাম কেড়ে নিল ৭৯৭ শিশু

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২১ জুলাই ২০২৬ | ৫:৪৫ অপরাহ্ন


চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ঢুকলেই চোখে পড়ে একই দৃশ্য- জ্বরে পুড়ে যাওয়া শরীর, সারা গায়ে লালচে র‍্যাশ, আর বিছানার পাশে বসে থাকা দিশাহারা এক মা-বাবা। দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি হাসপাতালেই গত চার মাস ধরে এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটছে অবিরাম। কারও সন্তান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে, কারও সন্তানের জন্য অপেক্ষা শেষ হচ্ছে চিরতরে। সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়- প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি পরিবারের অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া স্বপ্ন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গে দেশে আরও চারটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে- সিলেটে দুজন, রাজশাহীতে একজন ও ময়মনসিংহে একজন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে চার মাসের বেশি সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে প্রাণ হারাল মোট ৭৯৭ শিশু। গত ২৬ জুন এই মৃত্যুর সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়েছিল; মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে তা এখন ৮০০ ছুঁইছুঁই।

সংক্রমণের গতি এখনো কমেনি

শুধু গত ২৪ ঘণ্টায়ই হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার আটটি শিশু, যাদের মধ্যে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে ১৩০ জনের। আর গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৬ শিশুতে, যাদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ১৪ হাজার ৭০৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ২৪৪ শিশু। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯৮ হাজার ৪১১ জন- যা কিছুটা স্বস্তির খবর হলেও, প্রতিদিন নতুন করে যুক্ত হওয়া আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বলে দিচ্ছে, প্রাদুর্ভাব এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

কেন এত ভয়াবহ হয়ে উঠল এই প্রাদুর্ভাব

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি পর্যালোচনা অনুযায়ী, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল- টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ২০০০ সালের তুলনায় পরবর্তী বছরগুলোয় অনেকটাই বেড়েছিল। তবে ২০২৪-২৫ সালে দেশে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতির কারণে টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ কমে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়মিত টিকাদানের ফাঁক এবং ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না থাকা। এসব মিলিয়েই সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়ে যায়, যা বর্তমান প্রাদুর্ভাবের মূল ভিত্তি তৈরি করে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে আরও স্পষ্ট। টিকার কাভারেজ ৯৫ থেকে ৮০ শতাংশে নেমে আসাকেই তাঁরা হামের এই প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ বলে চিহ্নিত করছেন। একইসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ টিকাদান কর্মসূচিতে দেখা দেওয়া গাফিলতি। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ হওয়ায় টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ শুরু হলে তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে বড় আকার ধারণ করে- বর্তমানে ঠিক সেটিই ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার হামের টিকা অভিযান শুরু করেছে, যেখানে ৬ থেকে ৫৯ মাস অর্থাৎ ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে টিকা নিয়ে সরকারি বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে গরমিলের অভিযোগও উঠেছে একাধিক প্রতিবেদনে, যা অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

সংখ্যার আড়ালে যে বাস্তবতা

চার মাসের বেশি সময় ধরে প্রতিদিনই কোনো না কোনো জেলা থেকে আসছে নতুন মৃত্যুর খবর- কখনো তিনজন, কখনো পাঁচজন, কখনো আটজন। প্রতিটি সংখ্যা আসলে একেকটি পরিবারের ভাঙা স্বপ্ন, একেকজন মা-বাবার ফিরে না পাওয়া সন্তান। ৭৯৭ সংখ্যাটি যখন উচ্চারিত হয়, তখন তার পেছনে থাকে হাজারো নির্ঘুম রাত, হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষা, আর শেষ পর্যন্ত না ফেরা এক-একটি জীবন।

টিকার ঘাটতি পূরণ ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না হলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হবে বলেই মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ততদিন পর্যন্ত দেশের প্রতিটি হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে অপেক্ষা করছে আরও অনেক মা-বাবা, যাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রার্থনা—সন্তানের এই লড়াইটা যেন সফল হয়।