সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বৈধ পথে সৌদি গিয়ে প্রতারিত ৭০ প্রবাসী দেশে ফিরলেন

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৬ জুলাই ২০২৬ | ৮:৩৩ অপরাহ্ন

shah amanat airport
সরকারি সব নিয়ম মেনে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে সৌদি আরবে গেলেও প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন ৭০ জন প্রবাসী কর্মী।

রিক্রুটিং এজেন্সি ও কফিলের (মালিক) প্রতারণায় কাজ না পেয়ে অবৈধ হয়ে পড়ার পর সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তাঁরা আটক হন।

দীর্ঘদিন জেল খেটে অবশেষে নিঃস্ব অবস্থায় আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন এই বাংলাদেশিরা।

রোববার (২৬ জুলাই) সকাল ৮টা ১০ মিনিটে সালাম এয়ারের একটি বিশেষ ফ্লাইটযোগে (ওভি ৪০১) তাঁরা চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত এই প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ব্র্যাকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের আওতায় ১৯ জনকে তাৎক্ষণিক জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়।

নিঃস্ব হয়ে ফেরা এই বিদেশফেরত কর্মীদের জরুরি খাবার এবং নিজ নিজ এলাকায় নিরাপদে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে নগদ যাতায়াত খরচ হস্তান্তর করা হয়েছে।

ফেরত আসা প্রবাসীরা জানান, তাঁরা সবাই দালাল ও নিবন্ধিত এজেন্সির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ করে তিন মাসের ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে যান।

দালাল ও এজেন্সির প্রতিশ্রুতি ছিল, সৌদিতে পৌঁছানোর পর তিন মাসের মধ্যে কফিল বা কাজের নিয়োগকর্তা তাঁদের আকামা নবায়ন করে দেবেন।

তবে সৌদিতে পা রাখার পর কোনো মালিকের দেখা মেলেনি এবং চুক্তি অনুযায়ী কাজও পাননি তাঁরা।

ফলে তিন মাসের মেয়াদ শেষ হতেই সে দেশের আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ হিসেবে গণ্য হন এই প্রবাসীরা।

ময়মনসিংহের আসাদ জানান, দেড় বছর আগে স্থানীয় দালালের কথায় বিশ্বাস করে খাবার হোটেলের কাজে তিনি সৌদি গিয়েছিলেন।

কথা ছিল মালিক বিমানবন্দর থেকে নিয়ে যাবেন, কিন্তু কেউ তাঁকে নিতে না আসায় প্রথম দিন থেকেই তিনি সেখানে অবৈধ হয়ে পড়েন।

লুকিয়ে কিছুদিন ভবন নির্মাণের কাজ করলেও তিনি ঠিকমতো মজুরি পাননি।

ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আজ শূন্য হাতে দেশে ফিরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আসাদ।

একইভাবে সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে তিন মাসের কাজের অনুমতিপত্র নিয়ে সৌদি গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের মোঃ রাকিব।

বিএমইটির কার্ড ও বহির্গমন ছাড়পত্র থাকলেও তিনি চুক্তি অনুযায়ী কোনো কাজ পাননি।

তিন মাস কর্মহীন থাকার পর আকামা নবায়ন করতে না পেরে ২০ দিন কারাবন্দী থাকতে হয় তাঁকে।

দালাল ও এজেন্সির প্রতি বিশ্বাসের খেসারত দিয়ে আজ সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে তাঁকে।

নরসিংদীর রাজিব মিয়ার গল্পটাও একই রকম।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজের কথা বলে তাঁকে পাঠানো হলেও সেখানে গিয়ে মালিক বা কাজ কোনোটারই দেখা পাননি রাজিব মিয়া।

দেশ থেকে টাকা আনিয়ে কয়েক মাস চলার পর ১৫ দিন জেল খেটে অবশেষে পাঁচ মাসের মাথায় খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাঁকে।

ভুক্তভোগীরা জানান, সৌদি কারাগারগুলোতে এমন হাজার হাজার নথিহীন বাঙালি কর্মী মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) মোঃ মনিরুজ্জামান প্রবাসীদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি জানান, বিমানবন্দর হয়ে অবৈধ অভিবাসন বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

তবে নিয়মনীতি মেনে গিয়েও প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রবাস গমনেচ্ছুদের যেকোনো এজেন্সির প্রতিশ্রুতি বা দালালের কথা বিশ্বাস করার আগে সরকারের স্বীকৃত উৎস ও শর্তাবলী যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করার পরামর্শ দেন তিনি।

বিএমইটির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে কাজের উদ্দেশ্যে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন বাংলাদেশি বিদেশে গেছেন।

এর মধ্যে কেবল সৌদি আরবেই গেছেন ৭ লাখ ৫০ হাজার ৯৬৭ জন।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও অবৈধ অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির কারণে বিশাল এই শ্রমবাজার এখন হুমকির মুখে পড়ছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪৫ হাজারেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশফেরত অভিবাসীকে জরুরি সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।

এর মধ্যে কেবল চট্টগ্রামেই এই সহায়তা পেয়েছেন ৫ হাজারের বেশি প্রবাসী কর্মী।