
চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে কাসেম (ছদ্মনাম)। বছর সাতেক আগে জমি বন্ধক রেখে দালালকে টাকা দিয়ে দুবাই গিয়েছিলেন নির্মাণশ্রমিক হিসেবে। প্রথম কয়েক বছর ভালোই চলছিল- মাসে মাসে টাকা পাঠাতেন, বাড়িতে টিনের চাল বদলে পাকা ছাদ উঠেছিল। কিন্তু গত বছর কোম্পানি জানিয়ে দেয়, প্রকল্প শেষ, নতুন নিয়োগ বন্ধ, আর যাঁরা আছেন তাঁদের মধ্যে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন স্থানীয় নাগরিক আর যন্ত্র চালাতে জানা দক্ষ কর্মী। কাসেমের কাজ ছিল ইট বহন আর সাধারণ শ্রম- যা এখন করছে ক্রেন আর অটোমেটেড লিফটিং যন্ত্র। খালি হাতে দেশে ফিরে তিনি এখন বুঝতে পারছেন না, এই দক্ষতাহীন জীবন দিয়ে সামনে কী করবেন।
কাসেমের গল্পটা একা তাঁর নয়। এটা হাজারো বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
চার দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির অদৃশ্য চালিকাশক্তি। কিন্তু সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আমিরাতকরণ, কাতারের কাতারীকরণ- এসব নীতি এখন নিজ দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অটোমেশন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, আরব অঞ্চলে প্রায় ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ চাকরি-প্রায় ৮০ লাখ পদ-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আরও উৎপাদনশীল হয়ে উঠবে, আর প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ চাকরি, অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ পদ, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়করণের ঝুঁকিতে পড়বে।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০৩৫ সাল নাগাদ এই প্রযুক্তি-রূপান্তর অঞ্চলটির অর্থনীতিতে প্রায় ১৪১০ কোটি ডলার যোগ করবে এবং নিট প্রায় এক লাখ আঠারো হাজার নতুন চাকরি তৈরি করবে। কিন্তু এই সুবিধা সবার জন্য সমান নয়-যাঁরা পুনরাবৃত্তিমূলক, স্বল্প দক্ষ কাজ করেন, তাঁরাই সবার আগে হারাবেন জায়গা। আর বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের সিংহভাগ ঠিক সেই কাতারেই পড়েন।
এই সংকট আর দূরের কোনো পূর্বাভাস নয়, এখনই ঘটছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিদেশে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার হার প্রায় ৪১ শতাংশ কমে গেছে। শুধু নতুন কর্মী যাওয়াই কমেনি, ফিরেও আসছেন অনেকে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দশ মাসে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় চৌষট্টি হাজার বাংলাদেশি কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন, আর অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা এর একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে দক্ষতার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি কর্মীদের ক্রমেই পিছিয়ে পড়া। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে কাসেমের মতো একেকটা পরিবার, একেকটা ভেঙে পড়া স্বপ্ন।
একই বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করা ফিলিপাইন, ভারত, ভিয়েতনাম, নেপাল বা পাকিস্তান কিন্তু বসে নেই। ফিলিপাইন নার্স, কেয়ারগিভার, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করে চাহিদামাফিক জনশক্তি পাঠায়। ভারত প্রযুক্তি ও প্রকৌশল দক্ষতা দিয়ে বাজার ধরে রেখেছে। নেপাল ফিরে আসা শ্রমিকদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করছে, পাকিস্তান গড়ে তুলছে ডিজিটাল রিক্রুটমেন্ট আর দক্ষতা সনদায়ন ব্যবস্থা। এই দেশগুলো কম সংখ্যক কর্মী পাঠিয়েও বেশি আয় নিশ্চিত করছে। বাংলাদেশ এখনো আটকে আছে সংখ্যানির্ভর পুরোনো মডেলে-কত মানুষ গেল, রেমিট্যান্স কত এল, এই হিসাবেই সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাসে।
সমাধানের পথ জটিল নয়, কিন্তু জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দশকের চাহিদা বুঝে একটা সমন্বিত ‘দক্ষতা কূটনীতি’ দরকার। প্রশিক্ষণ সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কর্মীরা উচ্চমূল্যের চাকরিতে ঢুকতে পারেন। ভাষা, ডিজিটাল দক্ষতা আর প্রযুক্তি-জ্ঞানকে প্রশিক্ষণের বাধ্যতামূলক অংশ করতে হবে। বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে। আর সবচেয়ে জরুরি- অভিবাসনকে শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব না ভেবে শিক্ষা, শিল্প ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সমন্বিত কৌশল হিসেবে দেখতে হবে।
কাসেম এখন গ্রামে বসে দিনমজুরি খোঁজেন। তাঁর ছেলেটা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। কাসেম চান না ছেলে তাঁর মতো খালি হাতে বিদেশ যাক আর খালি হাতে ফিরুক। তিনি চান ছেলেটা একটা কারিগরি প্রশিক্ষণ নিক, একটা সনদ হাতে নিয়ে যাক, যাতে যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে না গিয়ে যন্ত্র চালানোর দক্ষতা নিয়েই যেতে পারে। এই একটি ইচ্ছার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের সামনের পথের উত্তর।
চার দশক ধরে আমরা মধ্যপ্রাচ্যকে সস্তা শ্রম দিয়েছি। আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্য আর সস্তা শ্রম কিনবে না, কিনবে দক্ষতা। কাসেমদের হাতে যদি আজই সেই দক্ষতা তুলে দেওয়া যায়, তবেই আগামীর মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ টিকে থাকবে- নইলে লাখো কাসেম শুধু ফিরেই আসতে থাকবেন, খালি হাতে, খালি চোখে।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।