
ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে তখন বিকেলের আলো পড়ে আসছে। সাইকেল চালিয়ে কাঞ্চননগর থেকে ছুটে আসা এক কিশোর নেটের সামনে দাঁড়িয়ে বল হাতে নিচ্ছে। বাঁহাতি লেগ স্পিন—চায়নাম্যান, যা সচরাচর দেখা যায় না। চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমির কোচ আমিনুল হক তখন তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। “জাতীয় দলের খেলোয়াড় কিংবা বিদেশি দলের খেলোয়াড়েরা চট্টগ্রামে এলে নেট অনুশীলনে ইমন বল করত। তাঁর ভালো সম্ভাবনা ছিল,” বলছিলেন তিনি।
কিন্তু ২০২০ সালের পর হঠাৎই মাঠ থেকে হারিয়ে যায় ছেলেটি।
পাঁচ বছর পর, সেই একই ছেলে—মোবারক হোসেন, ওরফে ডেভিড ইমন—এখন চট্টগ্রামের অন্যতম আলোচিত সন্ত্রাসীর নাম। তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা, নামের পাশে হত্যা-চাঁদাবাজি-অস্ত্রবাজির দীর্ঘ তালিকা। যে হাত একসময় ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করার জন্য বল ঘোরাত, সেই হাতেই এখন অস্ত্র—পুলিশ বলছে, ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহারে দক্ষ তিনি।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানালেন, দীর্ঘ পলায়ন-নাটকের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ধরা পড়েছেন ইমন।
ভারত সীমান্তে রুদ্ধশ্বাস ধাওয়ার এক রাত
গল্পের সূত্রপাত ১৩ জুন। রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আলোচিত যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে। পুলিশ তদন্তে নামে, এবং ২২ জুলাই ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ওই হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ইলিয়াস ওরফে ধামা ইলিয়াসকে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন, যা পুলিশকে ইমনের দিকে নিয়ে যায়।
কিন্তু ইমনকে ধরা মোটেও সহজ ছিল না। এসপি মাসুদ আলম নিজেই স্বীকার করলেন সেই ব্যর্থতার কথা: “আমরা তখন সফল হতে পারিনি।” দাউদকান্দি এলাকায় প্রথম দফা আটকের চেষ্টা ভেস্তে যায়—ঢাকায় পৌঁছে গাড়ি বদলে ফেলেন ইমন, এমনকি বদলে ফেলেন গাড়িচালকও। পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় চেকপোস্ট বসিয়েও লাভ হয়নি। “আমাদের ব্যাড লাক, আমরা ওই সময়ও তাঁকে ধরতে পারিনি,” বলেন এসপি।
তারপর শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য রাতের কাহিনি। খুলনার রূপসার দিকে চেকপোস্ট বসানো হলো, কিন্তু রাত সাড়ে তিনটার দিকে হঠাৎ গোপালগঞ্জ থেকে নড়াইলের পথ ধরলেন ইমন। নড়াইল থেকেও সরে গেলেন। শেষ পর্যন্ত ভোর পাঁচটায় যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকায়, স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় তিন সহযোগীসহ ধরা পড়েন তিনি। ততক্ষণে তিনি ভারতে পালানোর প্রস্তুতিও প্রায় সেরে ফেলেছিলেন—তাঁর কাছে পাওয়া যায় ‘ভারতীয় আধার কার্ড’ (এটি আসল কিনা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ), যেখানে তাঁর নাম লেখা “আজহার খান”। সীমান্ত পারাপারের প্রতিটি ধাপ—কে সীমান্ত পার করাবে, ভারতে কে রিসিভ করবে—সব আগে থেকেই ঠিক করা ছিল।
তবে গ্রেপ্তারের খবর প্রচার হয়ে যাওয়ায় একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়। একই সময়ে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অবস্থান করছিলেন ইমনের সহযোগী, বড় সাজ্জাদ বাহিনীর আরেক শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ রায়হান। “টিভি স্ক্রলে যখন আসে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার’, তখন আমাদের ওই টিম দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে তিনি পালিয়ে যান,” জানান এসপি মাসুদ আলম। রায়হানের পলায়ন নিয়ে তাঁর মন্তব্য ছিল ঝাঁঝালো—পালিয়ে গেলেও সে “দোজখ দেখে ফেলেছে।”
পাঁচ আগস্টের পরের শূন্যতায় জন্ম নেওয়া আতঙ্ক
ইমনের উত্থানের গল্প আসলে একটি বড় প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে—রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে তৈরি হওয়া শূন্যতা কীভাবে অপরাধের জমি তৈরি করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান ইমন, ঠাঁই নেন নগরের আতুরার ডিপো এলাকায়। সেখানেই ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে তৎকালীন শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে।
থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র হাতে তোলা তাঁর একটি ছবি তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অক্সিজেন এলাকায় ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সংঘর্ষে সক্রিয় অংশ নিয়ে বিদেশে পলাতক গ্যাং লিডার সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নজরে চলে আসেন তিনি।
এসপি মাসুদ আলম নিজেই স্বীকার করেন, “গত ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কিছুটা কম থাকার সুযোগে তাঁরা বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করেছেন।”
এরপরের অধ্যায়টি নিছক অপরাধের নয়, রীতিমতো আতঙ্কের এক ব্যবসায়িক মডেল। বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে ব্যবসায়ী-প্রবাসীদের কাছে চাঁদা দাবি করতেন ইমন—কখনো এককালীন দুই কোটি টাকা, মাসে দশ লাখ।
গণমাধ্যমে উঠে এসেছে তাঁর নিজের মুখেই বলা হুমকির ভাষা: “৫০ হাজার পুলিশ নিয়ে থাকলেও ঘরে গিয়ে মেরে ফেলব,” কিংবা “গুলি করে পুরো শরীর ভোমরার বাসা করে দেওয়া হবে।” এমন হুমকিতে কাজ না হলে সরাসরি হামলা—১১ জুলাই বাকলিয়ায় এক ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা চাওয়ার দুই দিন পরই সেখানে ভাঙচুর চালান তাঁর সহযোগীরা।
তবু গ্রেপ্তারের পরও এক অস্বস্তিকর সরলতায় নিজের পথ বেছে নেওয়ার কথা ব্যাখ্যা করেন ইমন। সন্ত্রাসের পথ বেছে নেওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, না হয় বড়লোক হব। বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে আছি।” একটি বাক্যে যেন ধরা পড়ে যায় পুরো গল্পের সারাংশ—উচ্চাকাঙ্ক্ষা যখন বৈধ পথ হারিয়ে ফেলে, তখন কোন দিকে গড়ায়।
নেটওয়ার্ক এখনো অক্ষত, প্রশ্ন থেকে যায় জবাবদিহির
পুলিশের ভাষ্যমতে, বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলীর নেটওয়ার্কে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী এখনো সক্রিয়। ইমন ও রায়হান—এই দুজন মিলে দলটির স্থানীয় নেতৃত্ব দিতেন, সিম ব্যবহার না করে বিদেশি নম্বর ও অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে পুলিশের নজরদারি এড়াতেন। এই ধরনের কৌশল নির্দেশ করে, শুধু একজন ইমনকে ধরে ফেলাই যথেষ্ট নয়—নেটওয়ার্কটি এখনো কার্যকর, এবং রায়হানের মতো শীর্ষ নেতা এখনো পলাতক।
এক প্রশ্নের জবাবে এসপি মাসুদ আলম জানান, এখন পর্যন্ত ইমন ও তাঁর সহযোগীদের অপরাধের পেছনে কোনো রাজনৈতিক গডফাদারের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজীদ থানার এক দস্যুতা মামলায় গ্রেপ্তারের মাত্র ২২ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পাওয়ার তথ্য একটি ভিন্ন প্রশ্ন তোলে—বিচারিক প্রক্রিয়ার এই দ্রুত জামিন কি তাঁর পরবর্তী অপরাধ-বিস্তারে ভূমিকা রেখেছিল? পুলিশ বলছে জামিনের পরই তাঁর কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়।
আপাতত ইমনকে একটি হত্যা মামলা ও দুটি অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-১ আদালতের বিচারক সায়মা আফরিন হিমা। তবে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা ১৫টি মামলার বাকিগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া কতদূর গড়ায়, নেটওয়ার্কের অন্য সদস্যরা কবে ধরা পড়ে, আর রায়হানের পলায়নের রহস্য কীভাবে উন্মোচিত হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে।
একজন প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটার থেকে চট্টগ্রামের ভয়ের প্রতীক হয়ে ওঠার এই যাত্রা যেমন একটি ব্যক্তির পতনের গল্প, তেমনি এক শহরের প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতারও দলিল।