
রাত তখন গভীর। কোরিয়ান ইপিজেড- কেইপিজেডের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল কুঠারের ঘা। নিরাপত্তারক্ষী তা লক্ষ করে এগিয়ে যেতেই দেখতে পান, একদল লোক গাছ কেটে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বাধা দিতে গেলেই নেমে আসে পাশবিক আক্রমণ- দা, কিরিচ আর রামদা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে চক্রের সদস্যরা। ভেঙে যায় তাঁর হাত।
একুশে পত্রিকায় গত ৫ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল এমনই এক রাতের বীভৎস চিত্র, যেখানে দেখা যায়- কেইপিজেডের সবুজ শিল্পাঞ্চলের অন্তরালে বাসা বেঁধেছে এক ভয়ংকর বনখেকো চক্র, যার নেতৃত্বে ছিলেন সালাউদ্দিন। সেই একই সালাউদ্দিন অবশেষে ধরা পড়লেন পুলিশের জালে। দীর্ঘদিনের আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে কেইপিজেড এলাকায় নেমে এসেছে স্বস্তির নিঃশ্বাস।
চাঁদাবাজি-ছিনতাইয়ের শীর্ষ হোতা গ্রেপ্তার পুলিশের জালে
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কর্ণফুলী থানা পুলিশ আজ সোমবার (৩ আগস্ট) অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে কেইপিজেড এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. সালাউদ্দিনকে (৩০)। কেইপিজেড ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ ব্যবসায়ী এবং পথচারীদের ওপর চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আগামীকাল মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) তাকে আদালতে পাঠানো হবে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার সালাউদ্দিন কর্ণফুলী থানার শাহমীরপুর রাজ্জাক পাড়ার (৫ নম্বর ওয়ার্ড) মো. ইব্রাহিমের ছেলে। পুলিশের ভাষ্যমতে, তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইন, চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে অন্তত পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের মে মাসের একটি সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলা (ধারা ৬(২)/৮/৯/১০) ছাড়াও ২০২৪, ২০২২ এবং ২০২১ সালের দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় (ছিনতাই, মারামারি, চুরি, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টা) আরও চারটি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সিএমপির বন্দর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আমিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. নাজিম উদ্দিন এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার (কর্ণফুলী জোন) জামাল উদ্দিন চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এই অভিযান। কর্ণফুলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিনের নেতৃত্বে এসআই মাহিন সরওয়ার ও পুলিশের একটি চৌকশ দল কেইপিজেড এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে সালাউদ্দিনকে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, কেইপিজেড এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সন্ত্রাসী দল গড়ে তুলেছিলেন সালাউদ্দিন। এলাকার সাধারণ মানুষের ওপর চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ চালিয়ে আসছিল তারা। কেউ প্রতিবাদ করলে চালানো হতো মারধর, এমনকি হত্যাচেষ্টাও।
কর্ণফুলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “সালাউদ্দিন কেইপিজেড এলাকার একজন চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও অপরাধী। তার চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের অত্যাচারে স্থানীয় মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। তাকে আজ গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আগামীকাল যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হবে।”
পুরোনো রেকর্ড বলছে, বারবার গ্রেপ্তার তবু থামেনি সন্ত্রাস
সালাউদ্দিনের এই গ্রেপ্তার নতুন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একুশে পত্রিকার গত ৫ মে-র “কেইপিজেডে বনখেকো চক্রের তাণ্ডব, দা-কিরিচের সামনে অসহায় পুলিশ” শিরোনামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরেই কেইপিজেড এলাকায় বেপরোয়া ছিল এই চক্র। সে সময়কার প্রতিবেদন অনুসারে, আসামিদের ধরতে গিয়ে পুলিশকেই উল্টো হামলার মুখে পড়তে হয়েছিল- কেইপিজেডের উত্তর গেইট এলাকায় সংঘবদ্ধ যুবকদের হামলায় অন্তত তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং একটি পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর হয়। সেই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছিল, আইনের প্রতিনিধি সামনে থাকা সত্ত্বেও যুবকদের মধ্যে কোনো ভয়ের চিহ্ন ছিল না।
সেই প্রতিবেদনে শিল্প পুলিশের একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছিলেন যে, এই চক্রের সদস্যদের পুলিশ এর আগেও কয়েকবার গ্রেপ্তার করেছিল, কিন্তু তাতেও তাদের অপতৎপরতা থামেনি। বারবার গ্রেপ্তার সত্ত্বেও কীভাবে এই চক্র ফিরে ফিরে সক্রিয় হয়ে উঠছিল, সেই প্রশ্নই তুলেছিল প্রতিবেদনটি।
আজকের এই গ্রেপ্তার তাই এলাকাবাসীর কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ- দীর্ঘদিনের সেই আতঙ্কের মূল হোতা অবশেষে আইনের আওতায় এলেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, চক্রের অন্য সদস্যরা কোথায়, আর সালাউদ্দিনের অনুপস্থিতিতে এই নেটওয়ার্ক সত্যিই থেমে যাবে কি না- তার উত্তর দেবে আগামী দিনগুলোই।