সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

দুবাইয়ে ফ্ল্যাট-বাড়ি, গোল্ডেন ভিসা— সাবেক ভূমিমন্ত্রীসহ ৭৩ জনের পেছনে দুদক

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৫ অগাস্ট ২০২৬ | ৯:৫৬ পূর্বাহ্ন

সাইফুজ্জামান চৌধুরী
সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ একসময় দেশের ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। দেশের মাটি, জমি, খতিয়ান- সবকিছুর অভিভাবক যেন তিনিই। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, দেশের সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে থেকে তিনি নিজেই বিদেশে সম্পদ গড়েছেন। দেশ থেকে অর্থ পাচার করে দুবাইয়ের অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট কিনেছেন, গোল্ডেন ভিসা নিয়েছেন। এখন সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

শুধু সাইফুজ্জামান নন। তাঁর সঙ্গে তালিকায় আছেন প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল, পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিস সরাফাতসহ মোট ৭৩ জন।

৫৪৯ থেকে ৭৩— বাছাইয়ের পর শুরু আসল অনুসন্ধান

শুরুতে অভিযোগ ছিল ৫৪৯ জন বাংলাদেশি অর্থ পাচার করে দুবাইয়ে ৩১৫ মিলিয়ন ডলারে ৯৭২টি আবাসনের মালিক হয়েছেন। দুদক সেই তালিকা ধরে কাজ শুরু করে। এনবিআর, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশনসহ একাধিক সংস্থার কাছ থেকে রেকর্ড সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই করা হয়। ঢাকা থেকে দুবাইয়ে যাওয়া-আসার প্রমাণ খোঁজা হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে চিহ্নিত হয়েছেন ৭৩ জন।

অভিযুক্তরা দুবাই মেরিনা ও পাম জুমেইরাহর মতো অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট ও বাড়ির মালিক হয়েছেন বলে তথ্য রয়েছে দুদকের কাছে। এঁরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশেষায়িত গোল্ডেন ভিসাও পেয়েছেন।

দুদকের অনুসন্ধান টিমে রয়েছেন উপপরিচালক আলমগীর হোসেন ও সহকারী পরিচালক আশীকুর রহমান।

দুবাইয়ের কাছে চাওয়া হবে তথ্য, আসছে এমএলএআর

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, পাচার অর্থে দুবাইয়ে অর্জিত সম্পদের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিএফআইইউ দুবাই ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে দুদকে পাঠাবে।

এরপর জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী সনদ ‘আনকাক’ অনুযায়ী সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রিকোয়েস্ট বা এমএলএআর পাঠানো হবে। সনদ অনুযায়ী সদস্য দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি আদান-প্রদান করে থাকে। সব তথ্য-প্রমাণ হাতে আসার পর কমিশনে প্রতিবেদন পেশ হবে, তারপর সিদ্ধান্ত নেবে দুদক।

৭৩ জনের মধ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, এইচ বি এম ইকবাল, চৌধুরী নাফিস সরাফাত ছাড়াও রয়েছেন আহসানুল করীম, আনজুমান আরা শহীদ, হুমায়রা সেলিম, জুরান চন্দ্র ভৌমিক, মো. রাব্বী খান, মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ ফাহিম আহমেদ, সৈয়দ হাসনাইন, গোলাম মোহাম্মদ ভূঁইয়া, হাজী মোস্তফা ভূঁইয়া, মনজ কান্তি পাল, মো. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, মো. মাহবুবুল হক সরকার, মোহাম্মদ ইলিয়াস বজলুর রহমান, এ কে এম ফজলুর রহমান, আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ, গুলজার আলম চৌধুরী, হাসান আশিক তাইমুর ইসলাম, খালেদ মাহমুদ, এম সাজ্জাদ আলম, মোস্তফা আমির ফয়সাল, সালিমুল হক ঈসা, সৈয়দ এ কে আনোয়ারুজ্জামান, সৈয়দ সালমান মাসুদ, আবদুল হাই সরকার, আহমেদ সামীর পাশা, ফাহমিদা শবনম চৈতি, মো. আবুল কালাম, ফাতেমা বেগম কামাল, মায়নুল হক সিদ্দিকী, মুনিয়া আওয়ান, সাদিক হোসেন মো. শাকিল, আবদুল্লাহ মামুন মারুফ, মোহাম্মদ আরমান হোসেন, মোহাম্মদ শওকত হোসেন সিদ্দিকী, মোস্তফা জামাল নাসের, আহমেদ ইমরান চৌধুরী, বিল্লাল হোসেন, এম এ হাশেম, মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন চৌধুরী, নাতাশা নূর মুমু, আহমেদ ইফজাল চৌধুরী, ফারহানা মোনেম, ফারজানা আনজুম খান, কে এইচ মশিউর রহমান, এম এ সালাম, মো. আলী হোসেন, মোহাম্মদ ইমদাদুল হক ভরসা, মোহাম্মদ রোহেন কবীর, মনজিলা মোর্শেদ, মোহাম্মদ সানাউল্যাহ চৌধুরী, মোহাম্মদ সরফুল ইসলাম, সৈয়দ রফিকুল আলম ও আনিসুজ্জামান চৌধুরীসহ আরও অনেকে।

দেশের মাটির অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এক সাবেক মন্ত্রী এখন দুদকের অনুসন্ধানের কেন্দ্রে। দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহ বা মেরিনায় ফ্ল্যাটের মালিক হওয়া মানুষগুলোর সম্পদের উৎস কোথায়— সেই প্রশ্নের জবাব এখন খুঁজছে দুদক। উত্তর আসবে দুবাই থেকে, আসবে আনকাকের পথ ধরে। অপেক্ষায় দেশের মানুষ।