
একসময় এখানে ছিল রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু। নেতাকর্মীদের ভিড়, সভা-সমাবেশ আর স্লোগানে মুখর থাকত তিনতলা ভবনটি। এখন সেই কার্যালয়ের মাঠে সারি সারি গাড়ি পার্ক করা থাকে। বারান্দায় চলে কুরিয়ার সার্ভিসের মালামাল ওঠানামা। ভবনের ভেতরে পড়ে থাকে পরিত্যক্ত বোতল, কাপড়চোপড় ও ময়লা-আবর্জনা। দুর্গন্ধে সেখানে দাঁড়ানোও কঠিন।
এটি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা কার্যালয়টি এখন অনেকটা পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলার বিভিন্ন স্থানে ভাঙা কাচ পড়ে আছে। সিঁড়ির রেলিং ক্ষতিগ্রস্ত। দেয়ালে অগ্নিসংযোগের পোড়া দাগ। ভবনের বিভিন্ন জায়গায় মলমূত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। নিচতলার মাঠে রাখা হয়েছে ডজনখানেক মাইক্রোবাস।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনতলা বিশিষ্ট বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় উদ্বোধন করেন। ভবনের নিচতলা ‘বঙ্গবন্ধু হল’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দ্বিতীয় তলায় নিয়মিত অফিস করতেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী।
তখন এই কার্যালয়ে নিয়মিত রাজনৈতিক সভা, কর্মসূচি ও নেতাকর্মীদের আনাগোনা ছিল। কার্যালয়ের সামনের মাঠে বিভিন্ন সময়ে দলীয় সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ওই দিন বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। কার্যালয়ের আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে আর দলটির নেতাকর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি দেখা যায়নি।
মাঠে এখন গাড়ির সারি

একসময় যে মাঠে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে মানুষের সমাগম হতো, এখন সেখানে গাড়ি রাখেন স্থানীয় চালকেরা।
মাঠে গাড়ি পার্কিং করে রাখা মাইক্রোবাসচালক শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘এখানে গাড়ি রাখলে কোনো ভাড়া দিতে হয় না। তাই আমরা গাড়ি রাখি।’
পাশেই গাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন অ্যাম্বুলেন্সচালক মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘রাতে গাড়ি চালানোর পর এখানে একটু বিশ্রাম নিই। কেউ ফোন করলে রোগী নিতে চলে যাই।’
কুরিয়ার সার্ভিসের মালামাল রাখা হয়
কার্যালয়ের বারান্দায় কথা হয় পাঠাও কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যান সাগর মাহমুদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর এখানে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীকে আসতে দেখিনি। তাই আমরা মালামাল আনা-নেওয়ার কাজে জায়গাটি ব্যবহার করছি।’
তিনি জানান, কুরিয়ারের গাড়িতে মালামাল আসার পর সেগুলো এখানে নামানো হয়। পরে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
রাতে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, রাত হলে পরিত্যক্ত কার্যালয়টিতে ভবঘুরে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। কেউ কেউ সেখানে রাতযাপনও করেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ যায়নি বলে জানিয়েছে থানা কর্তৃপক্ষ।
বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলেন, ‘ওই কার্যালয়ে রাতে অসামাজিক কার্যকলাপের বিষয়ে কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সেখানে ফোর্স পাঠানো হবে।’
সরকারি কাজে ব্যবহারের দাবি
স্থানীয় বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটি জনগণের অর্থে তৈরি করা হয়েছে। এখন এটি জনস্বার্থে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য জাওয়াদুল করিম বলেন, ‘এই কার্যালয় এখন অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষী। ধ্বংসাবশেষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর শিক্ষা নেওয়া উচিত।’
তবে কার্যালয়টি ভবিষ্যতে কী কাজে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকলে তা যেমন নষ্ট হয়, তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই কার্যালয়টির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।