
চট্টগ্রামের ৯৫৪টি চুক্তিতে কাজ শুরুর তারিখ চুক্তি সইয়ের আগের- এই তথ্য যত দপ্তরে তোলা হয়েছে, একটি ব্যাখ্যা প্রায় সবখানেই এসেছে।
দপ্তরের ব্যাখ্যা। চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন খালেদ লিখিতভাবে জানান, তারিখটি দরপত্র লাইভ করার সময় দেওয়া হয় এবং “এটি নির্দিষ্ট কোনো তারিখ না”; প্রকৃত শুরু “অনেক পিছিয়ে যেতে পারে, বা প্রক্রিয়া দ্রুত হলে এগিয়েও আসতে পারে।”
শিক্ষা প্রকৌশলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামের ভাষায়, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার সময় “টেন্টেটিভ একটা ডেট” দেওয়া হয়; প্রকৃত সূচনা হয় কার্যাদেশ থেকে।
বিধিমালা কী বলে। “আনুমানিক তারিখ” ধারণাটি ক্রয়বিধিমালায় সত্যিই আছে- তবে এক জায়গাতেই।
পিপিআর ২০২৫-এর তফসিল-৫, অংশ-ক [বিধি ২৫(১৩)] হলো উন্নয়ন প্রকল্পের ক্রয়-পরিকল্পনার ছক। সেখানে তিনটি তারিখকে বলা হয়েছে “Indicative Dates”- দরপত্র আহ্বান, চুক্তি সই ও চুক্তি সমাপ্তির প্রত্যাশিত তারিখ। ছকের ব্যাখ্যাতেও বারবার লেখা “anticipated date”, অর্থাৎ প্রত্যাশিত সময়।
কিন্তু সেটি পরিকল্পনার নথি- বছরের শুরুতে যা তৈরি হয়, দরপত্র ডাকার আগে।
চুক্তি প্রকাশের ছক আলাদা। বিধি ৪৯ ও তফসিল-১০ অনুযায়ী সেটি প্রকাশিত হয় চুক্তি সই হয়ে যাওয়ার পরে। সেই ছকে “indicative” বা “anticipated”- এই দুটি শব্দের একটিও নেই। নেই তফসিল-৯-এও, যেখানে চুক্তিসম্পাদনের তথ্য প্রকাশের কথা বলা আছে।
অর্থাৎ বিধিমালা আনুমানিক তারিখের ছাড় দিয়েছে পরিকল্পনার পাতায়, চুক্তির পাতায় নয়। ছাড়টি যেখানে দেওয়া হয়েছে আর যেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে- দুটি এক নথি নয়।
ফাঁক এক। সংখ্যাগুলো নেওয়া হয়েছে চুক্তি-প্রকাশের পাতা থেকে, যা প্রকাশিত হয় সই হয়ে যাওয়ার পরে। সেখানে শুরুর তারিখ সইয়ের ছয় সপ্তাহ আগের থাকলে তা আর প্রাক্কলন নয়।
ফাঁক দুই। ব্যাখ্যাটি কয়েক দিনের হেরফের বোঝায়, মাসের ব্যবধান নয়। ওই হাসপাতালেরই সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির চুক্তিতে প্রস্তাবিত শুরুর তারিখ চুক্তির ৮২ দিন আগে, ওষুধের চুক্তিতে ৭৫ দিন।
ফাঁক তিন। ব্যাখ্যাটি কেবল শুরুর ঘরটি ঢাকে। ১৪৪টি চুক্তিতে কাজ “শেষ” চুক্তি সইয়ের আগে- এর কোনো ব্যাখ্যা কেউ দেননি। আর ৩৭টি চুক্তিতে শুরু ও শেষ একই দিনে।
ফাঁক চার। সরেজমিনে ফারাকটি কয়েক দিনের নয়- বাকলিয়ায় প্রায় তিন মাস, চেঙ্গিতে কাজই শুরু হয়নি।
স্বাধীন মূল্যায়ন। টিআইবির পরিচালক ও ক্রয়-বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের বিশ্লেষণ: বাস্তবে চুক্তির আগে কাজ শুরু হয়ে থাকলে তা সুস্পষ্ট পিপিআর লঙ্ঘন; না হয়ে থাকলে তা সরকারি নথিতে পদ্ধতিগত ভুল তথ্যের প্রমাণ।
এবং যা পরে জানা গেল। “টেন্টেটিভ ডেট” ব্যাখ্যাটি শেষ পর্যন্ত টেকেনি- খণ্ডন এসেছে ওই দপ্তরের ভেতর থেকেই। শিক্ষা প্রকৌশলের নির্বাহী প্রকৌশলীর পরামর্শেই তাঁর দপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জামাল উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে কথা হয়; ব্যবস্থাটি এক দশক ধরে তিনিই চালান। তাঁর কাছে ধরা পড়ে, তারিখটি পরিকল্পনার প্রাক্কলন নয়- ই-জিপির ভেতরে একটি ধাপ সম্পন্ন না করায় থেকে যাওয়া স্বয়ংক্রিয় মান। সেই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ সিরিজের শেষ পর্বে।
তাই প্রশ্নটি “তারিখের ঘরে কী লেখা” নয়। প্রশ্নটি হলো- সরকারের একমাত্র ডিজিটাল ক্রয়-রেকর্ডে লেখা তারিখের ওপর নিরীক্ষক, গবেষক বা আদালত ভরসা করতে পারবেন কি না।
মূল প্রতিবেদন: চুক্তির আগেই ১৪৪ প্রকল্পের কাজ শেষ!