
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় অটোরিকশাচালক আবুল কালাম হত্যা মামলাটি তিন মাসের বেশি সময় ধরে তদন্তাধীন। দীর্ঘদিন কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হলেও গত ১৫ আগস্ট র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনজন। র্যাব পরে তাঁদের সাতকানিয়া থানায় হস্তান্তর করে। পরদিন তাঁদের আদালতে পাঠায় পুলিশ।
তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ, পরিকল্পনা ও অন্য কারও সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তথ্য জানতে গ্রেপ্তার তিন আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেনি পুলিশ। বাদীপক্ষের দাবি, রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে একাধিকবার অনুরোধ করা হলেও তাতে সাড়া দেওয়া হয়নি।
আবার র্যাবের হাতে তিন আসামি গ্রেপ্তার এবং পরে তাঁদের পুলিশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টিও গণমাধ্যমকে জানানো হয়নি। এতে হত্যা মামলার তদন্ত কতটা এগিয়েছে এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ অবশ্য বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তদন্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সার্কেল কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তাঁদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। রিমান্ডের আবেদন না করার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর অসুস্থতার কথা জানিয়েছেন।
যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ
গত ৫ মে সাতকানিয়ার খাগরিয়া ইউনিয়নের মৈশামুড়া এলাকার গরল খাল থেকে অটোরিকশাচালক আবুল কালামের (৪৫) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি উপজেলার কালিয়াইশ ইউনিয়নের বাসিন্দা।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, প্রতিদিনের মতো সেদিনও অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন আবুল কালাম। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পর গরল খালে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, মরদেহের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
এ ঘটনায় আবুল কালামের ভাই মো. আবুল কাশেম সাতকানিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরিবারের অভিযোগ, আবুল কালামকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে মরদেহ খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন পর তিনজন গ্রেপ্তার
মামলাটি দীর্ঘদিন কোনো আসামি শনাক্ত না হওয়ায় অনেকটা ‘ক্লু-লেস’ অবস্থায় তদন্তাধীন ছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। পরে র্যাব হত্যাকাণ্ডের ছায়া তদন্ত শুরু করে।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের একপর্যায়ে গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকা থেকে জিয়াউর রহমান জাহেদকে (২০) গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই কেরানিহাট এলাকা থেকে নুরুচ্ছামাদ (৫০) ও নুর ইসলাম ওরফে জাপানকে (৫৬) গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তিনজনকেই সাতকানিয়া থানায় হস্তান্তর করে র্যাব।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ জহির আমিন ১৬ আগস্ট দুপুরে তাঁদের আদালতে সোপর্দ করেন। তবে তাঁদের রিমান্ডে নেওয়ার কোনো আবেদন করা হয়নি।
কেন রিমান্ড চাওয়া হলো না
বাদী আবুল কাশেমের প্রশ্ন, র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিন ব্যক্তিকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও তাঁদের ভূমিকা জানার চেষ্টা করা হলো না কেন।
তাঁর ভাষ্য, আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, সহযোগী এবং অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে একাধিকবার রিমান্ডের আবেদন করার অনুরোধ করা হয়েছিল।
তবে ২০ আগস্ট বিকেল পর্যন্ত এ মামলায় রিমান্ডের কোনো আবেদন করা হয়নি।
রিমান্ড না চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ জহির আমিন বলেন, তিনি মামলাটির দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা। তাঁর আগে এসআই উত্তম রাজবংশী মামলাটি তদন্ত করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি মামলাটিতে অনেক কাজ করছি। আমাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই র্যাব আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে।’
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসামিদের আমি এবং সার্কেল স্যার জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাঁদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো কিছু পাওয়া যায়নি।’
রিমান্ডের আবেদন না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এরই মধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
তবে তদন্ত কর্মকর্তার এই বক্তব্যের সঙ্গে বাদীপক্ষের প্রশ্নের জায়গাটি থেকেই যাচ্ছে- আদালতের অনুমতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ না করেই কীভাবে নিশ্চিত হওয়া গেল যে গ্রেপ্তার তিন ব্যক্তির কাছ থেকে আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার নেই?
গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়নি কেন
এই মামলায় আরেকটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। র্যাব তিনজনকে গ্রেপ্তার করলেও তাঁদের সাতকানিয়া থানায় হস্তান্তরের বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়নি।
হত্যা মামলায় দীর্ঘ তদন্তের পর তিনজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য সাধারণত তদন্তের অগ্রগতি হিসেবে গণমাধ্যমে জানানো হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে কেন বিষয়টি প্রকাশ করা হয়নি, সে প্রশ্নেরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ফলে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে, র্যাবের তদন্তে তিনজনের বিরুদ্ধে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে, তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা কী এবং পুলিশের তদন্তে তাঁদের কাছ থেকে কী তথ্য পাওয়া গেছে- এসব বিষয় কেন স্পষ্ট করা হচ্ছে না।
তবে আসামিরা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
তদন্তের পরবর্তী ধাপ কী
আবুল কালাম হত্যার প্রায় সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেছে। র্যাবের হাতে তিনজন গ্রেপ্তার হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, হত্যাকাণ্ডে প্রত্যেকের ভূমিকা কী এবং তাঁদের সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
র্যাবের তদন্তে গ্রেপ্তারের ভিত্তি কী ছিল, জিয়াউর রহমান জাহেদের দেওয়া তথ্য কী, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেন অপর দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলো এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রাথমিক প্রমাণ রয়েছে- এসব তথ্যই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একই সঙ্গে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আবুল কালামের মৃত্যুর কারণ কী বলা হয়েছে, তাঁর শরীরে কী ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল এবং ফরেনসিক বা অন্যান্য আলামত থেকে কোনো তথ্য মিলেছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নিহতের পরিবারের প্রত্যাশা, দ্রুত তদন্ত শেষ করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে।
তবে তিনজন গ্রেপ্তার হওয়ার পরও তাঁদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আরও তথ্য নেওয়ার উদ্যোগ কেন দেখা গেল না, রিমান্ডের আবেদন না করার সিদ্ধান্তের পেছনে তদন্তগত কারণ কী এবং র্যাবের গ্রেপ্তারের তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হয়নি কেন- এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন পুলিশের তদন্তের স্বচ্ছতা ও অগ্রগতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।