সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

এক গ্রাম এক পণ্যে গ্রামেই ৭৫ লাখ কর্মসংস্থান

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৭ অগাস্ট ২০২৬ | ৯:৪৯ পূর্বাহ্ন


চট্টগ্রামের চন্দনাইশের বাদামতল গ্রামে শীতলপাটি বোনেন জাহানারা বেগম। বছরের পর বছর ধরে একই কাজ করছেন, কিন্তু ন্যায্য দাম পান না। মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে কিনে নেন, আর জাহানারা বেগম দিনশেষে পান সামান্য মজুরি। তাঁর মতো লক্ষ লক্ষ কারিগর সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছেন- তাঁত বুনছেন রাজশাহীতে, মাটির পাত্র গড়ছেন রাজশাহী-ময়মনসিংহে, শতরঞ্জি তৈরি করছেন রংপুরে। এঁদের হাতের নিপুণ কাজ দেশের গর্ব, কিন্তু জীবন তবু বদলায় না।

এই চিত্র বদলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এখন মাঠে নেমেছে সরকার-‘এক গ্রাম এক পণ্য’ কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে রূপান্তরের উদ্যোগ শুরু হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—গ্রামেই তৈরি হবে ৭৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান।

পাঁচ পণ্য দিয়ে শুরু, স্বপ্ন গোটা দেশকে নিয়ে

শীতলপাটি, শতরঞ্জি, তাঁতশিল্প, মৃৎশিল্প ও বুনন শিল্প- এই পাঁচটি পণ্য নিয়ে পাইলট প্রকল্প শুরু হচ্ছে। গত এক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, কোন এলাকার কোন পণ্যকে কীভাবে ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাত করা যায়, সে বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়েই কাজ করতে হবে। পরিকল্পনা শুধু পাঁচটি পণ্যেই থামছে না-ধাপে ধাপে দেশের প্রতিটি গ্রামের সম্ভাবনাময় পণ্যকে ব্র্যান্ডে পরিণত করার রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির জন্য সরাসরি ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

৭৫ লাখ কর্মসংস্থান, শুধু কারিগর নয় পুরো শৃঙ্খলজুড়ে

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ জানান, বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যে ৩৩-৩৪টি ওরিয়েন্টেশন কর্মশালা করা হয়েছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান শুধু কারিগরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলজুড়ে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে।

তাঁতি, মৃৎশিল্পী ও কারুশিল্পীর পাশাপাশি কাজ পাবেন প্যাকেজিং কর্মী, পণ্য ডিজাইনার, ই-কমার্স উদ্যোক্তা, ডিজিটাল মার্কেটার, পরিবহন ও ডেলিভারিকর্মী এবং রপ্তানি সহায়তাকারীরা।

এমনকি এসব পণ্য ঘিরে গ্রামীণ পর্যটন ও প্রদর্শনীকেন্দ্রেও কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সব মিলিয়ে ৭৫ লাখ মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন এই একটি কর্মসূচিকে ঘিরে।

বিবি রাসেলের নেতৃত্বে ডিজাইনার পুল, পূর্বাচলে ক্রিয়েটিভ হাব

গ্রামীণ পণ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল আধুনিক নকশার অভাব। সেই দুর্বলতা কাটাতে খ্যাতিমান ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলকে সামনে রেখে গঠিত হবে ‘ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স’। বিসিক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে তৈরি এই পুলের মাধ্যমে স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে পেশাদার ডিজাইনারদের সরাসরি সেতুবন্ধন তৈরি হবে।

পাশাপাশি পূর্বাচলে ১৬০ একর জমিতে গড়ে উঠবে সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব, যাকে ঘিরে ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক জেলা গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও আঞ্চলিক ক্রিয়েটিভ হাব গড়ার কাজ এগিয়ে চলছে।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে জাতীয় ব্র্যান্ড চালু, আন্তর্জাতিকমানের ফিল্ম স্টুডিও ও ওটিটি খাতের উন্নয়নের পরিকল্পনাও একই ছাতার নিচে রাখা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য—ক্রিয়েটিভ শিল্পের অবদান জিডিপিতে ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শুধু অবকাঠামো তৈরি করে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না- প্রয়োজন কার্যকর নীতি ও টেকসই ব্যবস্থাপনার ইকো-সিস্টেম।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদও বলছেন, বরাদ্দের আকারের চেয়ে অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং তার বিপরীতে কতটা কর্মসংস্থান ও বাজার তৈরি হচ্ছে, সেটিই আসল পরীক্ষা। কারণ রাশেদা বেগমের মতো লক্ষ কারিগরের জীবন বদলাতে হলে শুধু হাব বা পুল যথেষ্ট নয়। দরকার মানসম্মত কাঁচামাল, ব্যাংক ঋণ, কপিরাইট সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ।

স্বপ্নটা বড়, এখন দেখার বিষয়- বাস্তবায়নও সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে কি না।