
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী রুকমীলা জামানের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদের তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) পাঠিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।
সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম এই তথ্য জানান।
তিনি জানান, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রীর বিষয়ে এমএলএআর বা পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের মাধ্যমে এফবিআই এই তথ্য পাঠিয়েছে।
তবে এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে কী তথ্য রয়েছে বা কোনো সম্পদ জব্দ করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশ করেনি দুদক।
গত ১৩ জানুয়ারি আদালতের নির্দেশে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্টদের সাত দেশে থাকা ১ হাজার ৮২৪ কোটি ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯০৫ টাকার সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদের ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছিল ৪৩৬ কোটি ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ২৪২ টাকা।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের আইল অব ম্যান কর্তৃপক্ষ নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, তাঁর স্ত্রী নাসরিন ইসলাম এবং ওয়ান প্রপার্টি লিমিটেডের সম্পত্তি অবরুদ্ধ করার তথ্য দুদককে দিয়েছে।
আইল অব ম্যানে নিবন্ধিত ওয়ান প্রপার্টি লিমিটেডে নাসরিন ইসলাম ও নজরুল ইসলাম মজুমদারের ২৫ শতাংশের বেশি শেয়ার রয়েছে। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে ৭৮১ কোটি ৩১ লাখ ২২ হাজার ৪৫৪ টাকার মামলা করে দুদক।
এছাড়া ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিমকে আদালত তিন মাসের জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বিএফআইইউয়ের তথ্যমতে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০১৪ সালে র্যাপিড র্যাপ্টর এফজিই এবং ২০১৫ সালে জেবা ট্রেডিং এফজিই খোলেন।
দুবাই ইসলামিক ব্যাংক, ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের দুবাই শাখায় তাঁদের হিসাবে ৩৯ হাজার ৫৮৩ দিরহাম ও ৬ হাজার ৬৭০ ডলার জমা রয়েছে।
২০১৭ সাল থেকে গত মাস পর্যন্ত তিনি দেশটিতে ২২৬টি স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচা করেছেন। ২০২৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ও ৩০ নভেম্বর দুবাইয়ের আল-বারশা সাউথ-থার্ড এলাকায় রুকমীলা জামানের নামে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা মূল্যের দুটি সম্পত্তি কেনা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২১ সালের ৮ মার্চ থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত টিডি ব্যাংকে জিটিএস প্রপার্টিজ এলএলসির হিসাবে ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংক, এইচএসবিসি ব্যাংক এবং ক্যাপিটাল ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম লিমিটেডের মাধ্যমে ৪৫ হাজার ৩৪০ ডলার জমা হয়।
এছাড়া আরামিট প্রপার্টিজ এলএলসি ও জিটিএস প্রপার্টিজ এলএলসির পক্ষে ফার্স্ট আমেরিকান টাইটেল ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ডলার জমা দেওয়া হয়। নাহার ম্যানেজমেন্ট ইনকরপোরেটেডের মাধ্যমে ২০০৫ সাল থেকে দেশটিতে নয়টি সম্পত্তি কেনা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর আগে এক মন্ত্রীর বিদেশে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি ব্যবসার কথা জানিয়েছিল। যুক্তরাজ্যে রুকমীলা জামান, মেয়ে জেবা জামান এবং পারিবারিক গ্রুপ আরামিটের নামে কোম্পানি রয়েছে বলে জানা যায়।
এদিকে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে (ইউসিবি) সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার দাবিতে গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে আন্দোলন করেন দেড় শতাধিক শেয়ারধারী।
বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া চিঠিতে তাঁরা অভিযোগ করেন, ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরীর ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর স্বেচ্ছাচারিতায় ব্যাংকটি দেউলিয়া হওয়ার পথে।
চিঠিতে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে সাইফুজ্জামানের ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার সম্পদ ইউসিবির আমানতকারীদের টাকায় করা হয়েছে।
২০১৭ সালে পারটেক্স গ্রুপের মালিকদের সরিয়ে রুকমীলা জামান চেয়ারপারসন হলেও মূলত সাইফুজ্জামান ব্যাংকটি পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা থাকলেও ২০২৩ সাল শেষে তা ২ হাজার ৭৮২ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী জানান, প্রভাবশালীরা অর্থ পাচার করায় দেশে ডলার সংকট দীর্ঘমেয়াদি হয়েছে। পাচারকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চুক্তি করে অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।