
সকাল থেকেই উপজেলা কার্যালয়ের বারান্দায় চেয়ার পেতে বসেছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। কেউ এসেছেন জমির বিরোধ নিয়ে, কেউ জাতীয় পরিচয়পত্রের সমস্যা নিয়ে, কেউবা এসেছেন বছরের পর বছর জমে থাকা সীমানা বিবাদ নিয়ে।
ধর্মপুর গ্রামের বৃদ্ধ মো. আনোয়ার আলী এসেছেন সবচেয়ে দূর থেকে- উপজেলা সদর থেকে ২৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। কয়েক বছর ধরে চলে আসা প্রতিবেশীর সঙ্গে সীমানা বিরোধ নিয়ে আবেদন করেছিলেন, আজ ইউএনও ডেকেছেন। আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করছেন তিনি।
এটি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার প্রতি বুধবারের চিত্র। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত এই গণশুনানির আয়োজন করছেন। উপজেলার নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের অভিযোগ, মতামত আর সমস্যা নিজে শুনছেন, নিজেই সমাধান দিচ্ছেন।
একের পর এক সমস্যা, একের পর এক সমাধান
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সেবাগ্রহীতাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন ইউএনও। বাইরে বারান্দায় সারিবদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছেন সেবাগ্রহীতারা। একে একে প্রত্যেকে ভেতরে ঢুকছেন, কথা বলছেন, বের হচ্ছেন সমাধান নিয়ে।
শাহনগর গ্রাম থেকে জমি বিরোধের সমস্যা নিয়ে আসা মো. হামিদুল্লাহ বলেন, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিরিবিলি পরিবেশে একান্তে কথা বলে সহজভাবে সমস্যার সমাধান করা হয়েছে, যা সত্যিই বিরল।
সেবাগ্রহীতা মো. সাহেদুল আলম জানান, তাঁর দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়টি শুনে মানবিক ও জনবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গিতে দ্রুত সমাধান দেওয়া হয়েছে। উভয়পক্ষ সানন্দে মেনে নিয়েছেন, বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষোভ নিমিষে দূর হয়ে গেছে।
উত্তর ফটিকছড়ির দাঁতমারা গ্রাম থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সমস্যা নিয়ে আসা মো. কবির হোসেন বললেন, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে কথা বলতে পারলে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান সহজেই সম্ভব। এই উদ্যোগ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দিলে সেবার পরিধি যেমন বাড়বে, সরকারের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে।
‘জনগণ প্রশাসনের প্রতিপক্ষ নয়’
উপজেলা প্রশাসন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইউএনও সাহেবের সেবার মানসিকতা ও সংবেদনশীল আচরণ সব সেবাগ্রহীতার মনে দাগ কাটে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে তিনি আপন করে নিতে পারেন, এটিই তাঁর সাফল্যের মূল কারণ।
এই উদ্যোগ সম্পর্কে ইউএনও সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘মানুষের সেবার জন্যই প্রশাসন। জনতার সঙ্গে মিশতে হবে, তাদের মনের ভাষা বুঝতে হবে। জনগণ প্রশাসনের প্রতিপক্ষ নয়, তাই নিজেকে জনগণের সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাতেই প্রশাসনের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। জনতাকে ভালোবাসতে হবে, তাদের আপদে-বিপদে পাশে দাঁড়াতেই হবে।’
ধর্মপুরের বৃদ্ধ আনোয়ার আলীর কথায় ফিরে যাওয়া যাক। শুনানি শেষে সীমানা বিরোধের সমাধান পেয়ে ফিরে যাওয়ার সময় তিনি বলেন, সমাধান হয়েছে, অশেষ শুকরিয়া। আসাটা বৃথা যায়নি।
একজন বৃদ্ধের এই স্বস্তিই বলে দেয়, ফটিকছড়ির প্রতি বুধবারের এই ছোট্ট উদ্যোগটা আসলে কতটা বড়।