রাত তখন গভীর। ২০১৬ সালের এক থমথমে রাতে টেকনাফের নাফ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক তরুণ সাংবাদিক। ওপারে মিয়ানমারের আকাশ লাল- আগুনের লাল। ভেসে আসছে কান্না, আর্তনাদ, পোড়া গন্ধ। ছোট ছোট নৌকায় ভেসে আসছে মানুষ- যাদের ভিটেমাটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাদের পরিচয় কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
সামছুদ্দিন ইলিয়াস সেই রাতে নোটবুক খুলে লিখতে শুরু করলেন। কলম থামেনি। কারণ তিনি জানতেন, এই মানুষগুলোর কথা কেউ না বললে পৃথিবী জানবে না।
সেই একই কলম, সেই একই অদম্য মানুষ- এবার পেলেন আরেকটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। চীনের প্রযুক্তি নগরী শেনজেনে ২০২৬ সালের এশিয়া-প্যাসিফিক মিডিয়া পার্টনারশিপ প্রোগ্রামে তিনি জিতে নিলেন ‘এপিএমপি১০০ আউটস্ট্যান্ডিং পার্টিসিপেন্ট অ্যাওয়ার্ড’।
শেনজেনের আলোয় বাংলাদেশের সাংবাদিক
গত ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর। শেনজেনের চকচকে সম্মেলনকক্ষে তখন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো থেকে আসা সাংবাদিক আর গণমাধ্যমকর্মীরা একত্রিত। আলোচনার বিষয়- সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ, প্রযুক্তির ঢেউয়ে টিকে থাকার কৌশল, জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় মিডিয়ার দায়।
এই প্রোগ্রামের দ্বিতীয় অধিবেশনে বাংলাদেশ থেকে একাই যেন আলো ছড়ালেন সামছুদ্দিন ইলিয়াস। ব্যতিক্রমী অধ্যবসায়, সক্রিয় অংশগ্রহণ আর অসামান্য পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে এপিএমপি১০০ অর্গানাইজিং কমিটি তাঁকে তুলে দিল সম্মাননা সনদ। সঙ্গে উপহার একটি ইন্সটা৩৬০ ক্যামেরা।
পুরস্কার হাতে নিয়ে ইলিয়াস বললেন শান্ত কণ্ঠে, “প্রযুক্তি আর জলবায়ু পরিবর্তন মিডিয়ার দুনিয়াকে প্রতিদিন বদলে দিচ্ছে। এই স্বীকৃতি আমাকে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে, নতুন ধারণা খুঁজে নিতে আরও সাহস দেবে।”
ক্যামেরাটি নিয়েও তাঁর পরিকল্পনা স্পষ্ট- ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ে নতুন মাত্রা যোগ করবেন। কারণ গল্প বলার ভাষা এখন শুধু শব্দে নয়, দৃশ্যেও।
ঢাকার বাইরে থেকে যিনি বিশ্বকে নাড়া দেন
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ধারায় একটি অদ্ভুত বাস্তবতা আছে- সব আলো এসে পড়ে ঢাকায়। রাজধানীর বাইরে থেকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানো কঠিন, প্রায় অসম্ভব।
সামছুদ্দিন ইলিয়াস সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন।
২০১০ সাল থেকে সাংবাদিকতায় হাঁটছেন তিনি। চট্টগ্রাম থেকেই তাঁর কলম উঠে গেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। বর্তমানে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হিসেবে কাজ করছেন তিনি। এর আগে দ্য ইনডিপেনডেন্টের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান ছিলেন।
তাঁর প্রতিবেদন প্রকাশ পায় এএফপি, ডায়ালগ আর্থ, দ্য স্কটসম্যান, আনবায়াস দ্য নিউজ, স্ক্রল ডট ইনের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে তিনি কভার করেছেন গ্লাসগোর কপ২৬, দুবাইয়ের কপ২৭, বাকুর কপ২৯ আর ব্রাজিলের বেলেমে কপ৩০।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো- তিনি প্রান্তিক মানুষের গল্প বলেন। সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শ্রমিকের রক্তমাখা জীবন, উপকূলের ডুবে যাওয়া মানুষের অভিবাসনের বেদনা, মহেশখালী-সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভের নীরব মৃত্যু- এসব গল্প তিনি তুলে আনেন মাটির কাছ থেকে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে কাসাভা চাষ নিয়ে তাঁর একটি প্রতিবেদনের পর পাহাড়ে প্রতীকী বাঘ মিছিল হয়েছিল। মিরসরাইয়ের পরিবেশ ধ্বংস নিয়ে তাঁর রিপোর্টে নড়েচড়ে বসেছে হাইকোর্ট, জারি হয়েছে রুল।
আর একটি কিশোরীর ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনায় তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার করা রিট পিটিশনে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ হস্তক্ষেপ করে আইনি ব্যবস্থা নেয়। একটি লেখা একটি মেয়ের জীবন বদলে দিতে পারে- এটাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি।
পুরস্কারের ভার, দায়িত্বের ভার
স্বীকৃতি তাঁর কাছে নতুন নয়। তবু প্রতিটি পুরস্কার যেন তাঁকে নতুন করে ছুটিয়ে নিয়ে যায় মাঠে।
২০২৩ সালে ইউরোপিয়ান জার্নালিজম সেন্টার ও গুগল নিউজ ইনিশিয়েটিভ থেকে পেয়েছেন ক্লাইমেট জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড। ২০২২ সালে কভারিং ক্লাইমেট নাউ জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ডসে তাঁর প্রতিবেদন পেয়েছে সম্মানসূচক উল্লেখ। ২০২৬ সালে আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক সমর্থিত ‘ডার্ক সাইড অব দ্য বুম’ প্রজেক্টে বাংলাদেশের ডেটা-সেন্টার শিল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে তাঁর কাজ একসঙ্গে পায় সোপা অ্যাওয়ার্ড ও অসবর্ন এলিয়ট প্রাইজ।
ফেলোশিপের তালিকাটা আরও দীর্ঘ। ২০২২ সালে ওয়ার্ল্ড প্রেস ইনস্টিটিউট ফেলোশিপে গেছেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। ২০২৩ সালে সোসাইটি অব এনভায়রনমেন্টাল জার্নালিস্টসের ডাইভারসিটি ফেলোশিপে বোয়েস স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। ২০২১ সালে স্ট্যানলি সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির ক্লাইমেট চেঞ্জ মিডিয়া পার্টনারশিপ ফেলোশিপ। ২০১৮ সালে হংকং ব্যাপটিস্ট ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম ফেলোশিপে দুই মাস হংকংয়ে গবেষণা।
পুলিৎজার সেন্টার ও আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের অনুদানে কাজ করেছেন বঙ্গোপসাগর অঞ্চল নিয়ে। থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন ও ব্যাঙ্গালোরের জৈন ইউনিভার্সিটিতে নিয়েছেন অভিবাসন সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ।
শুধু নিজে শেখেননি, শিখিয়েছেনও। দেশে-বিদেশে অন্তত পাঁচ শতাধিক সাংবাদিক ও শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। ২০২৩ সালে সুইডেনের গোথেনবার্গে গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্স এবং ২০২৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ে সোসাইটি অব এনভায়রনমেন্টাল জার্নালিস্টস কনফারেন্সে আলোচক হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছেন।
সাংবাদিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিজ্ঞানের মঞ্চেও তাঁর উপস্থিতি। ২০২৩ সালের বার্ষিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে এবং ২০২৪ সালে ঢাকায় ১১তম এশিয়ান বাফেলো কংগ্রেসে জলবায়ু প্রভাব নিয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন। সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্টস ফোরামের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও সামলাচ্ছেন একইসঙ্গে।
এত পুরস্কার, এত স্বীকৃতি- কিন্তু ইলিয়াস নিজে জানেন, সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো সেই মুহূর্তটা- যখন একটা প্রতিবেদন লেখার পর কোনো একটা অন্যায় থামে, কোনো একটা জীবন বদলায়।
নাফ নদীর সেই রাতের কথা হয়তো তিনি ভুলে যাননি। সেই রাত থেকেই শুরু হয়েছিল এক দীর্ঘ যাত্রা- চট্টগ্রাম থেকে শেনজেন, নাফ নদী থেকে আমাজনের বেলেম। একটি কলম, একটি বিবেক, আর থামতে না জানা এক সাংবাদিক।