
কারখানা বন্ধ। উৎপাদন নেই। তবু প্রতিদিন কাগজে-কলমে বাড়ছে ‘সিস্টেম লস’। রক্ষণাবেক্ষণের নামে খরচের ফাইল ফুলে উঠছে। আর সেই ফাঁকে কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে বাইরের দোকান ও বাড়িতে- প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)-এ এই অনিয়মের চিত্র এখন আর গোপন নেই। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কীভাবে সিস্টেম লস ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে চলছে কোটি কোটি টাকার হরিলুট।
বন্ধ কারখানা, চলছে লোকসানের হিসাব
গ্যাস সংকটের কারণে সিইউএফএল বছরের পর বছর বন্ধ থাকছে। সম্প্রতি সাড়ে পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কারখানা বন্ধ থাকলেও লোকসানের হিসাব থামছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদন বন্ধ থাকা অবস্থায় দৈনিক গড়ে প্রায় দুই কোটি টাকা উৎপাদনজনিত ক্ষতি গোনা হচ্ছে। একইসঙ্গে কাগজ-কলমে কাল্পনিক ‘সিস্টেম লস’ ও ‘রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়’ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব লোপাটের অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিইউএফএলের একজন প্রধান প্রকৌশলী বলেন, “ভারী শিল্পে কারখানা চালু বা বন্ধ রাখার সময় কারিগরি কারণে ৫ থেকে ৭ শতাংশ সিস্টেম লস স্বাভাবিক ধরা হলেও সিইউএফএলের ক্ষেত্রে তা কখনো কখনো অস্বাভাবিক রূপ নেয়। অনেক সময় যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাত ও উৎপাদন ঘাটতি ঢাকতে অনভিজ্ঞ ব্যবস্থাপনার কারণে এই সিস্টেম লসের অঙ্কটা ফাইলপত্রে বাড়িয়ে দেখানো হয়।”
অবৈধ বিদ্যুৎ বিক্রির চাঞ্চল্যকর তথ্য
সিইউএফএলের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য একটি শক্তিশালী ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়ম ভেঙে সেই প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ কারখানার নিজস্ব মিটার ব্যবহার করে বাইরে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হচ্ছে।
তিনটি সুনির্দিষ্ট মিটারের মাধ্যমে রাঙ্গাদিয়া বাজারের শতাধিক দোকান ও সংলগ্ন বসতবাড়িতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। আর কারখানার বন্ধ দশাতেও এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহকে সিস্টেম লস ও অভ্যন্তরীণ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হিসেবে খাতায় তুলে রাখা হচ্ছে।
এমডির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্ত শুরু
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিইউএফএলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে। সেই অভিযোগের তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে সরাসরি সিইউএফএল গেটে গেলে নিরাপত্তা রক্ষীরা সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে প্রবেশে বাধা দেন। পরে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু এমডি কোনো সাড়া দেননি।
তবে এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদদাতাকে তিনি বলেছিলেন, “সিস্টেম লসের হিসাব সম্পূর্ণ কারিগরি মানদণ্ড অনুযায়ী করা হয়, এখানে কোনো কারসাজির সুযোগ নেই। আর বাইরে বিদ্যুৎ বিক্রির যে অভিযোগ উঠেছে, তা আমি দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। এটি কোন নিয়মে বা কীভাবে শুরু হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখছি এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিসিআইসির কঠোর হুঁশিয়ারি, তদন্ত কমিটি গঠন
সার্বিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুর রহমান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় সম্পদে কোনো ধরনের লুটপাট বা কারসাজি বরদাশত করা হবে না। সিইউএফএলের সিস্টেম লসের নামে কোনো অনিয়ম বা ভুয়া হিসাব দেখানো হলে এবং কারখানার ক্যাপটিভ প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ বাইরে অবৈধভাবে বিক্রির প্রমাণ মিললে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জবাবদিহিতাসহ পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিসিআইসি থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
পকেট কমিটি গঠনের অভিযোগ
শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে কারখানার শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে পকেট কমিটি গঠনের গুরুতর অভিযোগও উঠেছে বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, সিস্টেম লসের নামে অর্থ লোপাট ও অপচয় রোধ করা না গেলে প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করা অসম্ভব।
জুডিশিয়াল তদন্তের দাবি
রাষ্ট্রায়ত্ত এই মেগা প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ রক্ষায় এবং সিস্টেম লসের আড়ালের হোতাদের চিহ্নিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) একটি উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে।
বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি ও দীর্ঘ বন্ধের পর কারখানাটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভেতরের দুর্নীতির শেকড় না কাটলে কারখানা চললেও লোকসানের চাকা থামবে না- এটাই এখন সংশ্লিষ্টদের বড় উদ্বেগ।
এ বিষয়ে সিইউএফএল ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।