চট্টগ্রাম : সালাউদ্দীন আহমেদ রুবেল। পটিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক (পিয়ন)। ২০১৫ সালের আগস্ট থেকে এপর্যন্ত তিনবার বদলি হয়েছেন। এরপরও ঘুরেফিরে তার ঠিকানা হয় পটিয়া ভূমি অফিস। প্রভাবশালী এ কর্মচারীর বাড়ি বোয়ালখালী উপজেলার খরনদ্বীপ মুন্সিপাড়ায়। এসএসসি পাশ রুবেল সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন ২০০৪ সালে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ওই সময়ে তার মামা মোহাম্মদ ইউনুচ সরকারি চাকরিজীবী হয়েও ছিলেন ৮নং শ্রীপুর-খরনদ্বীপ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি। মূলত প্রভাবশালী ওই মামার তদবির জোরেই সরকারি চাকরি নামক ‘আলাদীনের প্রদীপ’ পেয়ে দ্রুত বদলে গেছেন রুবেল। অল্পদিনে এলাকায় পরিচিতি পেয়েছেন ‘কোটিপতি রুবেল’ নামে!
নিজ গ্রাম খরণদ্বীপ ও পার্শ্ববর্তী শ্রীপুর গ্রামে একের পর এক ক্রয় করছেন কোটি টাকা মূল্যের পুকুর, বাড়ি ও জমি। ক্রয় করা জায়গায় নির্মাণ করছেন সুরম্য দালান। এছাড়াও রয়েছে সিএনজি, মোটর সাইকেল, ব্যাংক ব্যালেন্সসহ নামে বে-নামে অনেক সম্পত্তি। চাকরিতে যোগদানের বছর দুয়েক পর কয়েক লাখ টাকা খরচে সেরেছেন জাঁকজমকপূর্ণ বিয়েপর্ব।
নিয়ম মতে, সরকারি চাকরিজীবী কোনোধরনের সংস্থা, সংগঠন, কোম্পানী কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো পদে আসীন থাকতে না পারলেও তিনি ঋণব্যবসা পরিচালনাকারী ‘মুন্সীপাড়া ইয়াং স্টার সমবায় সমিতি’ ও সামাজিক সংগঠন ইয়াং স্টার ক্লাবের পরিচালক। মামাত ভাই বিআরডিবি কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল বাকেরসহ ঋণদান সমিতিটি পরিচালনা করেন তিনি।
গত বছরে স্থানীয় কাদের মিয়ার ছেলে কামাল উদ্দিন থেকে ১২ শতক জায়গা ক্রয় করেছেন ১৮ লাখ টাকায় ও জহির উদ্দীনের ওয়ারিশ থেকে ৮ শতক জায়গা ক্রয় করেছেন ১২ লাখ টাকায়। নিজ এলাকায় পরিচালনা করেন একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। বোয়ালখালীর রুপালী ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংকে রয়েছে একক, যৌথ ও তার ঋণদান সংস্থার একাধিক ব্যাংক হিসাব।
সরকারী কর্মচারীর আচরণবিধি মোতাবেক স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় ও ইমারত নির্মাণে নিতে হয় বিভাগীয় প্রদানের অনুমতি। এসব নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একটির পর একটি জায়গা ক্রয় করছেন রুবেল। তৈরি করছেন বিলাসবহুল অট্টালিকা।
খরণদ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশেই তার রয়েছে একটি ব্যক্তিগত অফিস। ওই অফিসে বসেই পরিচালনা করেন ‘মুন্সীপাড়া ইয়াং স্টার সমবায় সমিতি’ ঋণদান কর্মসূচি। একই সাথে এখানে ভুমি সংক্রান্ত সেবা দিয়ে থাকেন তিনি। জেলার যে কোনো ভূমি অফিসের নামজারী খতিয়ান তৈরি করার চুক্তি পর্ব থেকে লেনদেন সবই সেরে ফেলেন ওই অফিসে বসেই। ওই অফিসে রয়েছে সরকারি ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথির স্তূপ, সারি সারি ফাইলপত্র। এসব ফাইলের স্তূপ ও ভূমি সংক্রান্ত দেন-দরবারের কারণে এ অফিসটি কোটিপতি রুবেলের ‘মিনি ভূমি অফিস’ বলেও পরিচিতি পেয়েছে স্থানীয়দের কাছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘সালাউদ্দীন রুবেলের চাকরির শুরু থেকে এ যাবত কালের বেতন এক করলেও তার মোট ক্রয় করা সম্পত্তির দশ ভাগের এক ভাগও হবে না। যে হারে একের পর এক সম্পত্তি তিনি ক্রয় করছেন, তাতে মনে হচ্ছে চাকরি জীবনে তিনি শত কোটি টাকার মালিক বনে যাবেন।
পটিয়া এলাকার বাসিন্দা শামসুদ্দোহা বলেন, ‘আমি একটি জায়গা নামজারী করার আবেদন করেছি। সালাউদ্দিন রুবেল আমার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা দাবি করে। তার দাবি মতো টাকা না দেওয়ায় আমার নামজারী খতিয়ান খারিজ করে দেয়। পরে আমি রুবেল ও তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে অভিযোগ দিলে গত ২৬ জুলাই তা পটিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে তদন্তের পাঠায়। বর্তমানে আমার অভিযোগ তদন্তাধীন।’
এছাড়া ফেসবুকে এসএ রুবেল নামের আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী, সরকারের মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে অত্যন্ত নোংরা, ঘৃণ্যতম প্রচারে মেতে উঠার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে সালাউদ্দিন রুবেলের বিরুদ্ধে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি-জামায়াত-শিবির সমর্থিত তিতুমিরের বাঁশেরকেল্লা, ইসলামের কেল্লা, বিশ্ব তরুণ প্রজন্ম, বিএনপি ও ১৮ দলের পেইজ সত্যের সন্ধানে ইত্যাদি পেইজের উসকানিমূলক পোস্ট শেয়ার দিয়ে সরকারবিরোধী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। তিনি ফেইসবুকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জমান নূর, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ সরকারের অনেক মন্ত্রী-এমপি’র ব্যাঙ্গাত্মক, বিকৃত, অশ্লীল ছবি শেয়ার করে বিভিন্ন সময় আলোচনায় আসলেও এ নিয়ে কখনো আইনের মুখোমুখি হতে হয়নি তাকে।
এসব বিষয়ে জানতে গত এক সপ্তাহ ধরে অসংখ্যবার ফোন দেয়া হয় সালাউদ্দীন আহমেদ রুবেলের রবি অপারেটরের মুঠোফোনে। প্রতিবারই তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এতদিন কোনোভাবেই তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। গত রোববার রুবেলের অফিসে প্রতিনিধি পাঠিয়ে তার বক্তব্য সংগ্রহ করে একুশেপত্রিকাডটকম।
অঢেল এ সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে আয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে সালাউদ্দীন রুবেল বলেন, জমি কিনে বাড়ি করার ক্ষেত্রে খরচ আমরা চার ভাই মিলে করেছি। মুন্সীপাড়া ইয়াং স্টার সমবায় সমিতির সাথে আমার সম্পৃক্ততা আছে কিনা- সেটা সমবায় অফিস তদন্ত করে দেখেছে। শামসুদ্দোহা নামের এক ব্যক্তির দেয়া অভিযোগ পটিয়ার ইউএনও স্যার তদন্ত করে দেখেছেন। তারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাননি।
ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বিকৃত ছবি ও সরকারবিরোধী নানা পোস্ট দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এসব আমাকে কেউ হয়তো ট্যাগ করেছে। আমি এ ধরনের কোনো কিছু শেয়ার করিনি।
একের পর এক জায়গা কেনার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান। বলেন, আমার পেছনে একটি পক্ষ লেগেছে। তারা আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে।