:: মামুনুল হক চৌধুরী ::
দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম, ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে সৃষ্টি হয়েছিল প্রিয় বাংলাদেশ। সেই পাকিস্তানের একটি ব্যাংক ‘ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান’ এর শাখা রয়েছে চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদে। চট্টগ্রাম ওয়াসার ১২৭ কোটির বেশি স্থায়ী আমানতের মধ্যে প্রায় ১৮ কোটি টাকা জমা রাখা হয়েছে পাকিস্তানের ওই ব্যাংকে। ওয়াসার মতো একটি সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের পাকিস্তানপ্রীতির বিষয়টি ‘রহস্যজনক’ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগ্রাবাদ শাখায় প্রায় ১৮ কোটি টাকা এফডিআর করে (ফিক্সড ডিপোজিট রেট) রাখা এই টাকা ফিরিয়ে এনে দেশের যে কোন সরকারি ব্যাংকে রাখার জন্য অডিট অফিসারের সুপারিশ থাকলেও তা মানা হয়নি। এক বছরের জন্য ১০ শতাংশ সুদ হারে ১৬ কোটি টাকা ও ৯ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ হারে দুই কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। যদিওবা পাকিস্তানের সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানিয়ে আসছেন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
দেশের তিনটি বেসরকারি ব্যাংকে ১০ শতাংশ সুদে আরো ৩০ কোটির বেশি এফডিআর করে রেখেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এ অবস্থায় একই সুদ হারে পাকিস্তানের ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রহস্যের।
চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর একটি হিসাব খুলে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের আগ্রাবাদ শাখায় ৯ কোটি ৮৭ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৯ টাকা এফডিআর করে রাখা হয়। ১২ মাস মেয়াদী ওই স্থায়ী আমানতের জন্য ১০ শতাংশ হারে সুদ দিচ্ছে পাকিস্তানের ব্যাংকটি। একই বছরের ১৫ অক্টোবর ১০ শতাংশ সুদে এক বছরের জন্য ৫ কোটি ৬৪ লাখ ৭৮ হাজার ৮০ টাকা ৮৪ পয়সা এফডিআর করে রাখা হয় ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের আগ্রাবাদ শাখায়।
এদিকে ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট নিরীক্ষা প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম ওয়াসাকে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়। এ সম্পর্কিত অফিস আদেশে লেখা হয়েছে যে, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে রক্ষিত সমস্ত আমানত অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং নিরীক্ষা দলের সুপারিশ মাফিক বাংলাদেশের যে কোন সরকারি তফসিলী ব্যাংকে স্থানান্তর করা যেতে পারে।
নিরীক্ষা দলের এই পরামর্শের পরও পাকিস্তানের ব্যাংক থেকে অর্থ স্তানান্তর করা হয়নি। ওই পরামর্শককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে নতুন করে আরো দুই কোটি টাকা এফডিআর করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষের দিকে দুই কোটি টাকা জমা রাখার বিষয়ে একটি অফিস আদেশ জারি হয়। এতে ৩১ জুলাই ওই চিঠিটিতে স্বাক্ষর করেন ওয়াসার বাণিজ্যিক সচিব বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য্য খোকন, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (অর্থ) আল মেহেদী শওকত আজম ও হিসাবরক্ষক (ক্যাশ ও ব্যাংক) মোহম্মদ সোহেল রানা।
দেশের এত ব্যাংক থাকতে পাকিস্তানের ব্যাংকে এফডিআর রাখার বিষয়টি বিস্ময়কর ও রহস্যজনক বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ব্যাংকে টাকা রাখার মধ্য দিয়ে ওয়াসার সংশ্লিষ্টদের জঙ্গিবাদ কনেকশনের তদন্তের দাবি উঠেছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার সচিব সামসুদ্দোহা বলেন, পাকিস্তানের ব্যাংকে এফডিআর করে টাকা রাখা হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। কোন কোন ব্যাংকে টাকা রাখা রয়েছে তাও আমি জানি না। এ বিষয়ে হিসাব শাখা জানবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগে থেকে পাকিস্তানের ব্যাংকে টাকা এফডিআর করে রাখা হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত ব্যাংকের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান আছে। পাকিস্তানের ব্যাংকে টাকা না রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তো কোন নির্দেশনা জারি করেনি।’
গত জুলাইয়ের শেষের দিকে নতুন করে দুই কোটি টাকা পাকিস্তানের ব্যাংকে রাখা প্রসঙ্গে ওয়াসা এমডি বলেন, ‘বোধহয়! আমার ঠিক মনে নেই।’
নারী সংগঠক ও আওয়ামী লীগ নেত্রী অ্যডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, পাকিস্তান আমাদের প্রিয় দেশের স্বাধীনতা চায়নি। ওয়াসার টাকা মানে সরকারের টাকা। এই টাকা পাকিস্তানের ব্যাংকে রাখা পাকিস্তানপ্রীতির বহিঃপ্রকাশ। আমাদের দেশের টাকা পাকিস্তানের ব্যাংকে বিনিয়োগ করে পাকিস্তান পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখা, এটা দুঃখজনক। সরকারি-বেসরকারি এত ব্যাংক থাকতে পাকিস্তানপ্রীতিটা কেন- সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
চট্টগ্রাম পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানের কাছ থেকে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এখন তো সব বৃথা মনে হচ্ছে। দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাকিস্তানপ্রেমীরা ঢুকে গেছে। রাজাকারদের শাস্তি দেওয়ায় পাকিস্তানের সংসদ নিন্দা প্রস্তাব করেছে। কোথায় তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, সেখানে তাদের ব্যাংকে সুদের জন্য বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এটার মধ্য দিয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। নিন্দা জানানোর ভাষা নেই।