মামুনুল হক চৌধুরী : ৬০ কর্মদিবসের মধ্যেই হবে নামজারী খতিয়ান। চট্টগ্রামের ষোলশহরস্থ ভূমি অফিসের তৃতীয় তলায় ঝুলানো সিটিজেন চার্টারে দেওয়া আছে এমন তথ্য। খরচ পড়বে সর্বসাকুল্যে ১১৫০ টাকা। তবে নির্দিষ্ট এ সময়ের মধ্যে কোনো নামজারী মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে কিনা জানা নেই ওই অফিসের কোন কর্মকর্তার!
প্রশ্নের জবাবে ওই অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এমনি লেখা আছে। ওই সময়ের মধ্যে কি করা যায়?’
সরেজমিনে দেখা গেছে, নামজারীর আবেদন করে বছরের পর বছর ঘুরছে এমন আবেদনকারীর সংখ্যা অনেক। আবার তদবির জোরে কেউ কেউ ‘দ্রুত’ কাজ সেরে নিচ্ছেন।
অভিযোগ উঠেছে অধিকাংশ সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ও সার্কিট হাউসে মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকেন। আবার কেউ কেউ ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকলেও মিটিংয়ে আছেন উল্লেখ করে অফিসে যান না। দেরিতে আসলেও জেলা প্রশাসনের অফিসে গেছেন বলে চালিয়ে দেন।
অভিযোগ রয়েছে ভূমি সংক্রান্ত মামলার আদেশে- পরবর্তী তারিখ কেন নির্ধারিত হলো সেই কারণ উল্লেখ থাকার নিয়ম (Speaking Order) থাকলেও তা মানা হয় না।
আবেদনকারীদের দাবি- কেন শুনানি হলো না বা কি কারণে পরবর্তী তারিখ নির্ধারিত হলো তা উল্লেখ করা হচ্ছে না মামলার আদেশে। সহকারী কমিশনারের (ভূমি) মর্জির উপর নির্ভর করছে একটি নামজারী মামলা কত দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।
অভিযোগ রয়েছে, এক শ্রেণীর দালালের হাত ধরে আবেদন জমা দিলে তা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যায়, কারণ এতে অবৈধ অর্থযোগ থাকে। কিন্তু আবেদনকারী নিজে আবেদন করলে বা আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন করলে ঘুষ আদায় করতে সমস্যায় পড়েন ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা। ফলে কাজই হয় না; আর হলেও দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়।
অভিযোগ রয়েছে, লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে এসব ভূমি অফিসে বদলি হয়ে এসেছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। ফলে তারা ওই টাকা পকেটে তুলে নিতে মরিয়া। তাই হয়রানী করে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সেবা প্রত্যাশীকে ঘুরিয়ে নির্ধারিত চাহিদার ঘুষ আদায় করেন।
অভিযোগ আছে, কোনো কর্মকর্তাই অফিসে ঠিক সময়ে আসেন না। সহকারী কমিশনাররা (ভূমি) অফিসে আসেন সকাল ১১টায়। কর্মচারীরা অফিসে আসেন সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টায়।
সরেজমিনে গত বুধবার সকাল ১০টায় ষোলশহর ভূমি অফিসে গিয়ে দুই সহকারী কমিশনারকে-ভূমি (আগ্রাবাদ ও চান্দগাঁও) অনুপস্থিত দেখা গেছে।
কেস স্টাডি-১:
৪ অক্টোবর, মঙ্গলবার, দুপুর ১২টা। ৮০ বছরের এক বয়োবৃদ্ধ সিরাজা খাতুন। ষোলশহর ভুমি অফিসের দ্বিতীয় তলার এক কোণে মেঝেতে বসে আছেন। একটি নামজারী মামলায় (২-১০৫৬/১৪) নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে মধ্যম হালিশহর থেকে এসেছেন তিনি। প্রথম বার এসেছিলেন চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি। এ পর্যন্ত দশ বারের আসা-যাওয়া হয়েছে বয়োবৃদ্ধ সিরাজা খাতুনের। প্রতিবারই কোনো না কোনো কারণে নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ভূমি কর্মকর্তার অনুপস্থিতি। ইতিমধ্যে সিরাজা খাতুন জেনেছেন আজও তিনি নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে পারবেন না। কারণ ভুমি কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি মিটিং নিয়ে ব্যস্ত আছেন। তাই নির্ধারিত হয়ে গেছে ‘জীবিত’ হিসেবে প্রমাণ করার পরবর্তী ধার্য্য তারিখ।
জানা যায়, সিরাজা খাতুনকে মৃত দেখিয়ে এক মাত্র ওয়ারিশ হিসেবে সনদ সংগ্রহ করে পাহাড়তলীর দক্ষিণ কাট্টলী মৌজার প্রায় বিশ কোটি টাকা মুল্যের জায়গা নিজ নামে খতিয়ান করার আবেদন করে সিরাজা খাতুনের সুলতান আহমদ নামের এক ছেলে। অথচ তিনি জীবিত এবং তার ছেলে মেয়েসহ ২১জন ওয়ারিশ রয়েছেন। খবর পেয়ে ওই নামজারী আপত্তি দিয়ে তিনি জীবিত আছেন তা জানানোর জন্য আসেন ষোলশহর ভূমি অফিসে। প্রতিবারই শুনানী পিছিয়ে পরবর্তী দিন ধার্য্য হয়ে যায়।
কেস স্ট্যাডি-২
গত বছরের ১২ নভেম্বর (নামজারী মামলা নম্বর ৩-১৫৬৪/২০১৫) নিজ নামে নামজারী খতিয়ানের আবেদন করেন মিছবাহ উদ্দিন আহমেদ মাসুদ নামের এক আবেদনকারী। এরপর ১৩ ডিসেম্বর, ১৩ মার্চ, ৭ এপ্রিল, ২১ এপ্রিল, ১৯ মে, ৯ জুন, ১১ জুলাই, ১১ আগস্ট, ৩১ আগস্ট, ২৯ সেপ্টেম্বর শুনানী হলেও নিষ্পত্তির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি ভূমি কর্মকর্তা। ফলে আগামী ২৭ অক্টোবর ফের শুনানীর জন্য দিন নির্ধারিত হয়েছে। তবে অধিকাংশ ধার্য্য তারিখে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ও সার্কিট হাউসে মিটিং নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন ভূমি কর্মকর্তা।
বেসরকারী কোম্পানীর কর্মচারী এই আবেদনকারী প্রতিটি ধার্য্য তারিখে অনেক অনুনয় বিনয়ে ছুটি ম্যানেজ করে আসেন ষোলশহর ভুমি অফিসে। উদ্দেশ্য নামজারী খতিয়ান নামের ‘সোনার হরিণ’ হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন তিনি। কিন্তু তারিখের পর তারিখ নিয়ে ফেরত যান তিনি।
মিছবাহ উদ্দিন আহমেদ মাসুদ বলেন, ‘আবেদনের সাত মাস পরও নামজারী খতিয়ান না হওয়ায় দ্রুত পাওয়ার আশায় জেলা প্রশাসকের বরাবরে গত ১৩ জুন একটি আবেদন করি। দ্রুত নিষ্পত্তি তো দূরের কথা, বরং আমি আবেদনটি করে বিপদেই পড়েছি। এরপর থেকে এক মাস পর পর মামলার তারিখ দিচ্ছেন এসি (ল্যান্ড)।’
কেস স্ট্যাডির দুটি মামলায় আবেদনকারীদের ভোগান্তির বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক সামশুল আরেফিনের। তিনি একুশেপত্রিকাডটকমকে বলেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো গাফিলতির কারণে বিলম্ব হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসন ভূমি সংক্রান্ত সেবা দ্রুত নিশ্চিত করার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।’
৬০ কর্ম দিবসে নামজারী মামলা নিষ্পত্তি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনগত জটিলতার কারণে বিলম্ব হয়। বিলম্বের কারণ নথিতে লিপিবদ্ধ করার নিয়ম রয়েছে। এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে তা হবে কর্মকর্তাদের গাফিলতি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত হলাম। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার পর ব্যবস্থা নেব। কারো গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেব।’
*** ডিসি অফিসের প্রধান সহকারী ইউনুছের ‘ধনকুবের’ কাহিনী
*** পিয়নের পরিচয় ‘কোটিপতি রুবেল’!
*** সেই কোটিপতি পিয়ন রুবেলকে বদলী