চট্টগ্রাম : দেশে পাটশিল্পের পুনর্জাগরণের জন্য সরকারের বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন ফাইট ফর ওমেন রাইটস-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু। সোমবার সকালে নগরের হোটেল আগ্রাবাদে পাটপণ্য মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
বেসরকারি সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশের সুইচ এশিয়া-জুট ভ্যালু চেইন প্রজেক্টের ব্যবস্থাপনায় ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এই মেলায় দেশের ১৩টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে।
পাটপণ্য নিয়ে চমৎকার এই আয়োজনের জন্য কেয়ার বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘আমাদের পাটের যে গৌরব, ঐতিহ্য তা হারিয়ে যেতে বসেছিল। এটিকে পুনরুদ্ধার করার জন্য এত চমৎকার আয়োজন, সত্যি আমি মুগ্ধ।’
তিনি বলেন, ‘পাটশিল্পের পুনর্জাগরণের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। রাষ্ট্রের আন্তরিকতা ছাড়া, পরিকল্পনা ছাড়া পাটের যে সম্ভাবনা রয়েছে, পাটের যে বাজার দখল করার বিষয়টি রয়েছে, সেটি সম্ভব নয়। আমি সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানাব, নারীঅধিকারের প্রশ্ন আসলে, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি খুব প্রয়োজন। নারীর নিরাপত্তার জন্য, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নটা খুব জরুরি।’
রেহেনা বেগম রানু বলেন, ‘আজকে আমরা পোশাকশিল্প যদি দেখি, আশির দশক থেকে শুরু করে এটি সামনের দিকে। দেশের ৭০-৮০ ভাগ অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছি, নারীদের কারণে। আমাদের দেশের মত দক্ষ নারীশ্রমিক অন্য কোথাও নেই। এদের হাতটাই হচ্ছে আসলে স্বর্ণখচিত একটা হাত। যে হাত দিয়ে স্বর্ণমুদ্রা অর্জন করছে বাংলাদেশ।’
‘নারীদেরকে প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, পোশাক শিল্পে। তেমনি এই পাটশিল্পেও প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে। অগ্রাধিকার বলতে আমি বুঝাচ্ছি, তাদেরকে দক্ষ শ্রমিকে পরিণত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজার দখল করতে হলে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে, এই বিশ্বায়নের যুগে, তাদের দক্ষতা অর্জনের জন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।’
নারীউদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। নারীদের তো অনেক সম্পদ নেই। তারা কখনো বাবা, কখনো স্বামী, আবার কখনো সন্তানের উপর নির্ভর থাকে। এই জায়গাগুলো থেকে তারা কীভাবে আত্মনির্ভরশীল হবে, নিজেই স্বাবলম্বী হবে, সেদিকে আমাদের সবার নজর দিতে হবে। সহজ শর্তে তারা যদি ঋণ না পায়, তাহলে কীভাবে দাঁড়াবে?’
তিনি বলেন, ‘আমি বিস্ময়ের সাথে দেখি, এখানে কামরুন (উইমেন চেম্বারের সভাপতি) আপা রয়েছেন, আমরা নারী উদ্যোক্তাদেরকে দেখেছি সবসময়, স্বামীর দিক থেকে এসেছেন। রেডিমেড জিনিস হিসেবে এসে ওনারা দখল করেন। আমি দুঃখিত, আমাকে এই কঠিন সত্যটা বলতে হয়েছে। আজ পর্যন্ত আমি বাংলাদেশে, আছিরন আপাকে দেখেছি। আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি, স্যালুট করছি। যেসব নারীরা তৃণমূল থেকে উঠে আসে, ঘাম ঝরিয়ে, ঘামকে রক্তে পরিণত করে, তাদের লাল সালাম জানাই। তাদের শ্রদ্ধা করি আমি। তারা তৈরি জিনিসে এসে কথা বলেন না। তাদের এই কষ্টটা আমি হৃদয় দিয়ে শোনার চেষ্টা করি, বোঝার চেষ্টা করি, অনুভব করার চেষ্টা করি। এই চেষ্টাটা আজকে রাষ্ট্রকে করতে হবে। প্রতিবন্ধী যন্ত্রের মতো না হয়ে, সুস্থ যন্ত্র হতে হবে রাষ্ট্রকে। হৃদয় দিয়ে রাষ্ট্রকে অনুভব করতে হবে। রাষ্ট্রের চোখ-কান খোলা থাকতে হবে।’
রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘মোট জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। এই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারীর নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রকে হৃদয় দিয়ে কথা বলতে হবে। শুধু মাথা দিয়ে কথা বললে হবে না। মাথা ও হৃদয় দুটোর সমন্বয় থাকতে হবে। অনেক নারী উদ্যোক্তার সাথে আমি কথা বলেছি; তারা বলেছেন, আমরা কী মর্টগেজ রাখবো। ব্যাংক তো মর্টগেজ চায়। ৫০ হাজার টাকা ঋণ দিয়ে আমার কী হবে। গ্যারান্টার চায়। আমি ১৫ বছর জনপ্রতিনিধি ছিলাম। আমি অনেকের গ্যারান্টার হয়েছি। পরে আমার নামেই তো ওয়ারেন্ট ইস্যু হবে। আমি যদিও এসবকে ভয় পাই না। তারপরও আমার নিরাপত্তার একটা প্রশ্ন আসে।’
‘সুদমুক্ত বা কম সুদে নারীদের ঋণ দিতে হবে। যেমন সরকার কৃষিঋণ দিচ্ছে। ২ শতাংশ, ৩ শতাংশ সুদে কৃষিঋণ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে। যেমন ভারতে, ইনসেনটিভ দেওয়া হচ্ছে। এক লাখ হলে এক হাজার টাকা। তাহলে এক কোটি হলে এক লক্ষ টাকা। এক্ষেত্রে ভারতকে আমরা রোল মডেল ধরতে পারি। আমার পার্শ্ববর্তী ভারত পাটশিল্পের জন্য কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেদিকে আমরা নজর দিতে পারি।’-যোগ করেন রেহানা বেগম রানু।
তিনি বলেন, ‘আপনারা জেনে বিস্মিত হবেন, পাট দিয়ে আসবাবপত্র তৈরি হচ্ছে। ভালো মানের অসাধারণ, অতুলনীয় শাড়ি তৈরি হচ্ছে। আরো ভালো মানের শাড়ি কীভাবে তৈরি হবে, সেই দক্ষতা অর্জন করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানিপণ্য হতে পারে পাট। সে সম্ভাবনা আছে। পোশাক শিল্প আজ কোথায় দাঁড়িয়েছে, এটাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে পাটশিল্প।’
পাটশিল্পের শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য তাদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এতে রাষ্ট্রের সহযোগিতা লাগবে। নারী উদ্যোক্তাদের তৃণমূল থেকে বের করে এনে উইমেন চেম্বারের সাথে যুক্ত করা যায়। রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পেলে ভারতকে হটিয়ে পাটশিল্পে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজার দখল করবে।’
কেয়ার বাংলাদেশের সুইচ এশিয়া-জুট ভ্যালু চেইন প্রজেক্টের টেকনিক্যাল ম্যানেজার (লার্নিং অ্যান্ড এডভোকেসী) আরশাদ হোসেন সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রজেক্টের টিমলিডার শেখর ভট্টাচার্য্য। প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বারের সভাপতি কামরুন মালেক, বিশেষ অতিথি ছিলেন সুইচ টু জুট কনসোটিয়ামের সভাপতি সান্তনা মমতাজ, চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বারের ডিরেক্টর আবিদা মোস্তফা।
নারী উদ্যোক্তাদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন- রংপুর থেকে আসা মোছাম্মৎ আছিরন নেছা।