বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২

সীমান্ত হাটের জন্য জমি দিয়ে বিপাকে তাঁরা

| প্রকাশিতঃ ১০ জানুয়ারী ২০১৭ | ১:০৯ পূর্বাহ্ন

শরীফুল রুকন: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হাট স্থাপন করা হয়েছে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার মোকামিয়া মৌজায়। এ হাট স্থাপনের জন্য ২০১৩ সালের মাঝামাঝিতে প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। এক্ষেত্রে জমির প্রকৃত মালিকদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। তবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে জমির মালিকদের টাকার পরিবর্তে অন্যত্র খাস জমি বন্দোবস্ত এবং সীমান্ত হাটে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার আশ্বাস দেয় স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু তিন বছর পার হলেও এখনো ক্ষতিপূরণ বা জমি বন্দোবস্তি পাননি জমির দুই মালিক। এ নিয়ে অভিযোগ জমা পড়েছে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে।

অন্যদিকে কয়েকজন জমির মালিককে সরকার ক্ষতিপূরণ হিসেবে অন্যত্র জমি বন্দোবস্তি দেয়। এরমধ্যে বন্দোবস্তি পাওয়া একজনকে জমির দখল বুঝিয়ে দেয় সরকার। তবে প্রভাবশালী মহলের হুমকি, হামলা-মামলা করে তাকে সেখান থেকে উচ্ছেদের অপচেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সীমান্ত হাট স্থাপনে ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগী নাসিমা আক্তার বলেন, ‘আমার মরহুম স্বামী নুর হোসেন (ছোট্ট) এর নামে মোকামিয়া মৌজার ৩৩৬ খতিয়ানের ১৮১৮ দাগের ও ৩৭৯ খতিয়ানের ১৮১৮, ১৮২১ দাগের জায়গায় সীমান্ত হাট নির্মান করা হলেও আমরা কোন ক্ষতিপূরণ পাইনি। স্থানীয় ছাগলনাইয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কাছে দফায় দফায় যোগাযোগ করেও কোন ক্ষতিপূরণ বা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোন জমি বন্দোবস্তি পাইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে দুই সন্তান নিয়ে কষ্টে দিনপার করছি। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে গত বছরের ৫ মে ফেনীর জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেও কোন ক্ষতিপূরণ পাইনি। এ প্রেক্ষিতে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় গত ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আবেদন করেছি।’

একই খতিয়ানের মালিক মৃত নুরুল আমিনের ওয়ারিশরাও কোন ধরনের ক্ষতিপূরণ বা জমি বন্দোবস্তি পাননি বলেও জানিয়েছেন নাসিমা আক্তার।

জানা গেছে, সীমান্ত হাট প্রতিষ্ঠার ক্ষতিগ্রস্থ প্রজা হিসেবে মৃত মীর হোসেন মোল্লার ওয়ারিশ মো. আবু বকর ছিদ্দিককে ২৭ শতক জমি ক্ষতিপূরণ হিসেবে বন্দোবস্তি প্রদান করে সরকার। গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারী উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো-সার্ভেয়ার, থানা পুলিশ ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে জমির দখল বুঝিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী, হুমায়ন কবির মজুমদার, এনামুল হক মজুমদার ও তাদের সহযোগিরা আবু বকর ছিদ্দিককে উচ্ছেদের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে হামলা ও মামলায় জড়ানো হচ্ছে আবু বকর ছিদ্দিককে।

এ প্রসঙ্গে ভুক্তভোগী আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, ‘সীমান্ত হাটে ক্ষতিগ্রস্থ প্রজা হিসেবে সরকার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ছাগনাইয়া উপজেলা ভূমি অফিসের বন্দোবস্তি মামলা (নম্বর ১/১৪) মূলে আমাকে ২৭ শতক জমি বন্দোবস্তি প্রদান করে। গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারী থানা পুলিশের উপস্থিতিতে উক্ত জমির দখল বুঝিয়ে দেয় ভূমি অফিস।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর খতিয়ান সৃজন করে সরকারী খাজনাসহ কর পরিশোধ করি। তারপর থেকে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি আমাকে উচ্ছেদ করার অপচেষ্টা করছে। বিষয়টি স্থানীয় ছাগলনাইয়া উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে এই প্রভাবশালী মহলটির নানা হয়রানির কারণে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’

ছাগলনাইয়া থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী, হুমায়ন কবির মজুমদার ও এনামুল হক মজুমদারের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৫ মার্চ একটি জিআর মামলা (নম্বর ৬৯) করা হয়েছে। এই মামলায় আসামিদের অভিযুক্ত করে চার্জশীট দেয়া হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

এদিকে সীমান্ত হাটের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ রুহুল আমিন বলেন, ‘আমাদেরকে সামান্য জমি বন্দোবস্ত দিলেও এখনো জমি বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। সীমান্ত হাটে দোকান বরাদ্দ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও কোন দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এমনকি পাশ বা আইডি কার্ড পর্যন্ত দেয়নি প্রশাসন।’

আরেক ক্ষতিগ্রস্থ শাহ আলম বলেন, ‘আমাদের নিজের নামীয় খতিয়ানভুক্ত জমি সীমান্ত হাটের জন্য জেলা প্রশাসকের নামে রেজিষ্ট্রি করে দিয়েছি। নিয়ম অনুযায়ী এর বিনিময়ে আমরা সরকারের কাছ থেকে কোন এ্যাওয়ার্ড সনদ পাইনি।’

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন সোহেল বলেন, ‘সীমান্ত হাটে জায়গা দিয়ে যারা সহযোগিতা করেছেন, তারা বিশাল মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। এ ত্যাগের জন্য তাদেরকে আমরা সব ধরনের সহযোগীতা দেব।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘সীমান্ত হাটের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের সমস্যা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দেব।’