শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

একজন বিনয়ী ডাক্তারের বিদায় এবং কিছু স্মৃতি

প্রকাশিতঃ শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২০, ১১:০৮ অপরাহ্ণ


সুবর্ণা বড়ুয়া তুলি : আমার ছাত্র শতদ্রু মিত্র, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. তাপস মিত্রের ছেলে। চিটাগাং গ্রামার স্কুলে শতদ্রু যখন ক্লাস থ্রি-তে পড়তো তখন থেকে জানতে পারলাম সে ক্লাসে কোন ধরনের কথা বলে না। অর্থাৎ কোন শিক্ষকের সাথে কথা বলে না। কিন্তু ক্লাসে সে ঠিকমতো লেখার কাজটা করে। বন্ধুদের সাথে কথা বলে। শুধুমাত্র ক্লাসরুমে টিচারের সাথে কোনো রকম কথা বলে না, টিচারের অনেক চেষ্টার পরেও।

আমি তখন শতদ্রুর কোন ক্লাস নিতাম না। শতদ্রুর ব্যাপারে শোনার পর আমি তাকে স্কুলের ক্যাফেটেরিয়া, খেলার মাঠে ফলো করতাম, দেখতাম সে তার বন্ধুদের সাথে কথা বলছে, হাসছে, খেলছে। কিন্তু যেই আমি কিংবা অন্য কোন শিক্ষক কাছে যেতাম তার কথা বলা বন্ধ!

এভাবে দুই বছর তাকে দূর থেকে অবজার্ভ করলাম। ২০১৬ সালে সে যখন ক্লাস ফাইভে তখন আমি তার ক্লাসের বিষয় শিক্ষক ছিলাম। দেখলাম শতদ্রু খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী। তখন থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম যেভাবেই হোক শতদ্রুকে ক্লাসে কথা বলাবোই। সাথে স্কুল কর্তৃপক্ষও শতদ্রুকে কাউন্সিলিং করছিল ক্লাসে কথা বলার জন্য।

সেসময় স্কুলে ডা. তাপস মিত্রের সাথে একবার কথা হয়েছিল, খুবই বিনয়ী একজন মানুষ। তাকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করতাম আমিসহ আরো কয়েকজন শিক্ষক মিলে। শতদ্রুর জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে পুরষ্কার ঘোষণা করলাম কথা বলার জন্য। তিনমাসের মধ্যে আমরা সফল হলাম!

শতদ্রু ক্লাসে শিক্ষকসহ সবার সাথে কথা বলছে! প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, সবকিছুতে রেসপন্স করছে! তার কথা বলা দেখে শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবাই খুশি। সেবছর স্কুলের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে শতদ্রুর মা আমাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ আর আবেগে কান্না করে দিলেন। উনি বললেন, মিস আপনার জন্যই আমার ছেলে ক্লাসে কথা বলছে। উনার কথা শুনে আমারও চোখে জল আসলো।

সে বছর আমার বাচ্চাদের জন্য আমি আগস্ট মাসে সিজিএস-এ রিজাইন দিই। তার দুইমাস পর একদিন রাতে আমার স্বামী চেম্বার থেকে এসে বললেন, তার পরিচিত এক ডাক্তারের কাছ থেকে ডা. তাপস মিত্র ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করে আমার ফোন নম্বর চাইলেন। এরপর ডা. তাপস মিত্র আমাকে ফোন করে শতদ্রু মিত্রের জন্য আশীর্বাদ চাইলেন! কারণ কিছুদিন পর তাঁর ছেলে ক্লাস ফাইভের সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। ডা.তাপস মিত্রের কথায় এত বিনয়, এত সম্মান ছিল তা শিক্ষক হিসেবে আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।

আমার পরিচিতজনের কাছ থেকে ডাক্তার হিসেবে উনার মানবিকতার কথা শুনেছি। আজ শুনলাম এ বিনয়ী, মানবিক মানুষটা সকালে হঠাৎ করে মারা গেছেন! আমার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে বিনয়ী, মানবিক এ ডাক্তার এত তাড়াতাড়ি চলে গেলেন! শতদ্রু ও তার বোন এ বয়সে তাদের বাবাকে হারালো! আমি শতদ্রুর নিষ্পাপ, হাসিমাখা মুখটা ভুলতে পারছি না। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা, শতদ্রু ও তার পরিবার এ শোক যেন সইবার শক্তি পায়। ডা. তাপস মিত্রের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি আমি।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, চিটাগাং গ্রামার স্কুল (সিজিএস)।