শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

করোনাঝুঁকি বাড়িয়ে চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির পিকনিক-শোডাউন!

প্রকাশিতঃ শনিবার, নভেম্বর ২১, ২০২০, ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : আসন্ন শীত মওসুমে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ রুখতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে অবিরাম। কিন্তু তার মধ্যেই সোশ্যাল ডিসট্যান্সিংকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কক্সবাজারে জমজমাট পিকনিকে মেতেছে চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতি।

শুক্রবার (২০ নভেম্বর) চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির ব্যানারে ৫শ’ সদস্য তাদের পরিবার নিয়ে পিকনিক করতে গেছেন কক্সবাজারে। শনিবার সন্ধ্যায় তাদের চট্টগ্রাম ফেরার কথা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনাকালের বনভোজনে সামিল হওয়া আইনজীবী সমিতির সদস্যরা সেখানকার হোটেলে থাকছেন গাদাগাদি করে। স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। সমুদ্রপাড়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে একসঙ্গে নাচানাচি করছেন তারা। অভিভাবকদের সাথে বনভোজনে গেছে অসংখ্য শিশুও। করোনাকালীন এমন আয়োজন নিয়ে আদালত অঙ্গন ছাড়াও চট্টগ্রাম জুড়ে চলছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সাবেক অনেক নেতা করোনাকালীন সময়ে বনভোজনের বিরোধিতা করলেও শোনেননি বর্তমান নেতারা। এদিকে একসঙ্গে ৫শ’ লোকের আয়োজন করায় অতিমাত্রায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

অনেক আইনজীবীর অঅভিযোগ, বনভোজন নয়, মুলত এটি নির্বাচনী শোডাউন। আর এই শোডাউন করতে গিয়ে সহকর্মীদের স্বাস্থ্যের কথা একবারও ভাবেননি তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুক্রবার সকালে মোট ১৩টি বাসে করে পরিবার নিয়ে সমিতির ৫০০ জন সদস্য কক্সবাজার যান। তারা ওঠেন ‘হোটেল সী ওয়ার্ল্ডে’। বনভোজনের জন্য প্রত্যেক সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৬শ’ টাকা করে। এ হিসেবে টাকা সংগ্রহ হয়েছে ১৩ লাখ টাকা। হোটেলে এক রাত থাকা, দুইবেলা নাশতা, তিনবেলা খাওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। কিন্তু টাকা সংগ্রহ হয়েছে ১৩ লাখ টাকা। অভিযোগ আছে, বাড়তি ওই টাকা নেওয়া হয়েছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছ থেকে।

করোনারকালে এত লোক নিয়ে বনভোজন আয়োজন করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত জানতে চাইলে শুক্রবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচএম জিয়াউদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা বনভোজনে এসেছি। মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার এবং হোটেলে থাকার ব্যবস্থাপনাও সেভাবে করেছি। আমরা করোনার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়েই বনভোজনের আয়োজন করেছি।’

রাতে কক্সবাজার বিচে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন সম্পর্কে সমিতির এ নেতা বলেন, ‘আসলে যেটা আয়োজন করেছি সেটি একটি ছোট কালচারাল প্রোগ্রাম। জাতীয় পর্যায়ের কোনও শিল্পী নয়। লোকাল শিল্পীরা এ অনুষ্ঠানে গাইবেন। তবে বড় একটি কনসার্ট করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু করোনার জন্য সেটা বাতিল করেছি।’

চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির একাধিক সদস্য অভিযোগ করে বলেছেন, বার্ষিক বনভোজনের আড়ালে মূলত এটা আসন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনী শোডাউন। কারণ এবারও সমিতির নির্বাচনে আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের ব্যানারে লড়বেন আওয়ামী ঘরানার আইনজীবী এএইচএম জিয়াউদ্দিন।

এদিকে, এবারের বনভোজনে কোনও সিনিয়র আইনজীবী অংশ নেননি বলে জানা গেছে। বিষয়টি স্বীকার করলেও পিকনিকের আড়ালে নির্বাচনী শোডাউন করার বিষয়টি নাকচ করে দেন এডভোকেট জিয়াউদ্দিন।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নেতা জিয়াউদ্দিন বলেন, প্রতিজন সদস্য থেকে ২ হাজার ৬শ’ টাকা করে নেওয়া হলেও বাস্তবে খরচ হচ্ছে জনপ্রতি ৩ হাজার ২শ’ টাকা। আইনজীবী সমিতির সদস্যদের মধ্যে যারা বিত্তশালী বা শুভাকাঙ্ক্ষী তারাই পিকনিকের বাড়তি এই টাকার জোগান দিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে, বনভোজন যাওয়ার সময় বাসে বিশ্বজিত চক্রবর্তী নামে এক আইনজীবী ফেসবুক লাইভে আসেন। এসময় তার মুখে কোনও মাস্ক ছিল না। একই বাসে থাকা আইনজীবী সমিতির কিছু নারী সদস্যদের মুখেও মাস্ক দেখা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচএম জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ করেছি। কিন্তু কেউ যদি কথা না শুনে কী করার আছে। তবে আমরা পিকনিকের এ আয়োজন করেছি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে।’

এদিকে করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যে এ ধরনের বনভোজন আয়োজন করতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নিষেধ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট মুজিবুল হক।

তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে করোনাকালে পিকনিকের আয়োজন না করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সমিতির ৮০ ভাগ সদস্য তরুণ ও যুবক। তারা মনে করে করোনার মধ্যে সবকিছুই তো খোলা। তবে আমরা যখন বনভোজন যেতে নিষেধ করেছিলাম তার আগেই পিকনিকের জন্য ৩০০ জন সদস্যের বুকিং হয়ে গেছে। কক্সবাজারে হোটেলেও বুকিং মানি দিয়ে ফেলেছিল। তাই প্রোগ্রাম বাতিল করা যায়নি বলে সমিতির নেতারা আমাদের জানিয়েছেন।’

করোনাকালীন সময়ে বনভোজনের নামে কক্সবাজারে নারী-শিশুসহ ৫ শতাধিক লোকের জমায়েত স্বাস্থের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে গোটা দুনিয়ায় এখন ১৫০ কোটি শিশু ঘরবন্দি। তারা আছে প্রচণ্ড মনস্তাতাত্ত্বিক চাপে। এ মুহূর্তে তাদের স্বাস্থ্যবিধির উপর কড়া নজর রাখতে হবে অভিভাবকদের।’

ইদানীং দেখা যাচ্ছে শিশুদের করোনায় আক্রান্তের হার বেড়ে গেছে। শিশুরা মারাও যাচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে করোনায় আক্রান্ত অনেক শিশু ভর্তি আছে। সুতরাং অভিভাবক হিসেবে এ মুহূর্তে আমাদের কী করা উচিত তা আমাদের বুঝতে হবে। সচেতনতার বিষয়ে কোনও ছাড় দেওয়া যাবে না। এই শীতকালে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে করোনার প্রকোপ বেড়েছে। শিশুদের কোথাও নিয়ে যেতে হলে এক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা আছে। একসাথে কোথাও জমায়েত হওয়া যাবে না। কড়াকড়িভাবে সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং মেনে চলতে হবে।-যোগ করেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।