শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

দখলমুক্ত সড়ক ফের দখলে নিতে নতুন প্রতারণা, চসিককে হুঁশিয়ারি!

প্রকাশিতঃ শনিবার, নভেম্বর ২১, ২০২০, ১১:৩৪ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : নগরের উত্তর কুলগাঁও এলাকায় একটি প্রভাবশালী চক্র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও সাধারণ অধিবাসীদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে চসিক’র ভ্রাম্যমাণ আদালত গত ৯ নভেম্বর ‘সোবহান কোম্পানি সড়ক’ নামে জনসাধারণের চলাচলের একটি রাস্তা অবৈধ দখলমুক্ত করেন।

রাস্তাটির প্রবেশমুখে পাকা দেয়াল নির্মাণ করে গত ১৩ বছর ধরে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিল স্থানীয় আব্দুর রাজ্জাক, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, আব্দুস সোবহানের ছেলে আবদুল হাকিম, আবদুর রহমান, আবদুর রহিম এবং সামশুল হক ভূঁইয়াসহ প্রভাবশালী একটি চক্র।

অভিযোগ আছে, আব্দুর রাজ্জাক নামের ব্যক্তিটি নিজেকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তাফা কামালের মেয়ের জামাই পরিচয় দিয়ে স্থানীয় নিরীহ লোকদের নানাভাবে হয়রানি করে আসছেন। তারই অংশ হিসেবে চক্রটি চসিকের উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে পোশাক কারখানার ২০/২৫ জন নারী শ্রমিককে ভাড়া করে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশও করেছে কয়েকদিন আগে। শুধু তাই নয়, সমাবেশ থেকে চসিককে হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে চসিক’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা কাগজপত্র দেখে সোবহান কোম্পানি সড়কের প্রবেশ পথ থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছি। এখন এটা নিয়ে কারো যৌক্তিক বক্তব্য থাকলে চসিকের উপরের লেবেলে বলতে পারে। যেটা আইনসম্মত আমরা সেটাই করব।’

চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে চসিক তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তাদের হুঁশিয়ারিতে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ ‘পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়। এই দখলবাজরা আমার কাছেও এসেছিল, আমি তাদের পাত্তা দেইনি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব আমরা পালন করেছি, যেহেতু এখন আইনি একটা বিষয় আছে তাই পুলিশ প্রশাসন এখন বিষয়টা দেখবে।’

এখানেই শেষ নয়, চক্রটি নিজেরা বাদি হয়ে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় দায়ের করা অভিযোগকে হাতিয়ার করে নতুন প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে শুক্রবার (২০ অক্টোবর) রাস্তাটির মাঝখানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ মর্মে একটি সাইনবোর্ড গেড়ে দিয়েছে।


উক্ত সাইনবোর্ডে লেখা আছে, মিচ মামলা-১৩৭৯/২০২০ (বায়েজিদ) ফৌ. কা. বিধি আইনের ১৪৫ ধারায় সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, অত্র মালিকানার জায়গার উপর দিয়ে সর্বসাধারণের চলাচল আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। – আদেশক্রমে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।

আইনজীবীরা বলছেন, ১৪৫ ধারায় নোটিস জারির পর বিরোধীয় বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালতে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বাদি-বিবাদি উভয়পক্ষকে শান্তিশৃংখলা বজায় রাখতে হবে। কিন্তু ১৪৫ ধারার নোটিস জারির আগেই যেখানে চসিকের ভ্রাম্যমাণ আদালত রাস্তাটির অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে, সেখানে ১৪৫ ধারার নোটিসকে ইস্যু বানিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নাম ব্যবহার প্রতারণার সামিল এবং আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া দেশের যে কোনও আদালত চলাচলের রাস্তা দিয়ে জনসাধারণকে হাঁটতে নিষেধের আদেশ দেবেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘১৪৫ ধারায় আনা অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বাদি-বিবাদি উভয় পক্ষকে শান্তিশৃংখলা বজায় রাখতে হবে। কিন্তু চলাচলের রাস্তা দিয়ে জনসাধারণ হাঁটাচলা করতে পারবে না এমন আদেশ কখনও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়ার কথা নয়। এটা এক ধরনের প্রতারণা।’

এদিকে চসিকের উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে উক্ত চক্রটি সম্প্রতি প্রতিবাদ সমাবেশ করায় সোবহান সোসাইটির বাসিন্দাসহ এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ চরম ক্ষুব্ধ। তারা দ্রুত ওই প্রভাবশালী চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা নিজামুল হক বলেন, ‘যারা চলাচলের রাস্তাটি ফের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তারা স্থানীয় ভূমিদস্যু চক্র। ১৩ বছর সোবহান সোসাইটির রাস্তায় দেয়াল তুলে প্রতিবন্ধকতা দিয়ে রেখেছিল। চসিকের ভ্রাম্যমাণ আদালত সেটি মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে গেছেন। তবু ওই ভূমিদস্যু চক্রের প্রতারণা থেমে নেই। তারা চসিকের উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।

এদিকে, শুক্রবার উক্ত চলাচলের রাস্তায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশের নামে সাইনবোর্ড গেড়ে দেওয়া এবং কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসীদের উৎপাতের ব্যাপারে ভুক্তভোগীরা পুলিশকে খবর দেন। এরপর সিএমপির উপ কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাকের নির্দেশে একদল পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উক্ত সাইনবোর্ড উপড়ে ফেলে এবং কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করে দেয়।

এ প্রসঙ্গে সিএমপির উপ কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যারা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশের নামে চলাচলের রাস্তা ফের বন্ধ করতে চায় তাদের বিষয়ে আদালতকে জানাব। তবে গতকাল শুক্রবার আমাদের পক্ষে যা করণীয় তা করেছি। অন্যায়-অনিয়ম হলেই আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো।

বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি প্রিটন সরকার বলেন, ‘কাউকে আদালতের নির্দেশ অমান্য করতে দেওয়া হবে না।, কেউ অমান্য করতে চাইলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় সুত্র জানায়, সোবহান কোম্পানি সড়ক দিয়ে উত্তর কুলগাঁও এলাকায় কয়েক হাজার বাসিন্দার বাড়িঘরের জন্য ১১ হাজার ও ৩৩ হাজার ভোল্ট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঞ্চালন লাইন বিদ্যমান আছে। ১৩ বছর আগেও এগুলো রক্ষণাবেক্ষণে কোনও অসুবিধা ছিল না। প্রভাবশালীরা ওই রাস্তা দখল করে দেয়াল নির্মাণ করার পর বিপাকে পড়ে যায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা। গত ৯ নভেম্বর অভিযান চালিয়ে চসিকের ভ্রাম্যমাণ আদালত দেয়াল গুড়িয়ে দেওয়ায় স্বস্তি ফিরে আসে এলাকাবাসীর মাঝে।

আব্দুল আউয়াল নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘বিগত ১৩ বছর আমরা আতংকের মধ্যে ছিলাম। কারণ কোনও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তা নেভানোর জন্য এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল ভূমিদস্যু চক্রটি। অবশেষে ১৩ বছর পর সেই রাস্তা ধরে চলাচলের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন সাহেব। তার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।’

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) এর উপ-মহাব্যবস্থাপক (বিপনন) মোহাম্মদ রফিক খান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা দিয়ে যাওয়া গ্যাসলাইন রক্ষণাবেক্ষণে কেউ বাধার সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো।’

### অর্থমন্ত্রীর মেয়েজামাই পরিচয়ে রাস্তা দখলের চেষ্টা, বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
### চসিকের রাস্তা উন্মুক্ত করার প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে কিশোর গ্যাং লেলিয়ে