শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

অভিনব করোনা-প্রতিরোধক বুথ তৈরির ‘ভূত’ যেভাবে চাপল বাবরের মাথায়

| প্রকাশিতঃ ২ জুলাই ২০২১ | ১২:৫৭ অপরাহ্ন


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : বিশেষ পদ্ধতিতে রাখা বোতলের বাটনে চাপ দিলে হাতে আসবে জীবাণুনাশক হ্যান্ড স্যানিটাইজার, টাকা উত্তোলনের মত সংগ্রহ করা যাবে ১টি করে মাস্ক। পাশাপাশি ডাস্টবিনে ফেলা যাবে ব্যবহৃত মাস্কও। আর এই সেবা সকলের জন্য উন্মুক্ত, নেওয়া যাবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

বলছিলাম এটিএম বুথের আদলে তৈরি করোনা প্রতিরোধক বুথের কথা। বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ ও পথচারীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক উপ অর্থ-সম্পাদক হেলাল আকরব চৌধুরী বাবরের এমন অভিনব পন্থা নগর ছাপিয়ে ছাড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। ‘করোনা ঠেকাতে ফ্রি মাস্ক’ এমন স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া এই বুথ খুব অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে দেশের বাইরেও।

শুরুটা হয়েছিল গত ১ মে নগরের এনায়েত বাজার, নন্দনকানন ও আন্দরকিল্লা মোড়ে প্রথম করোনা প্রতিরোধক বুথ স্থাপনের মধ্য দিয়ে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কার্যালয় থেকে শুরু করে নগরের প্রায় শ’খানেক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে এই বুথ। শিগগিরই নগরের আরো ৫শ’ পয়েন্টে বসতে যাচ্ছে করোনা প্রতিরোধক বুথ।

বিনামূল্যে বাবরের এই করোনা প্রতিরোধক বুথ স্থাপন থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী ৪১টি ওয়ার্ডের জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান, রেলস্টেশন, বাসস্টেশন, শপিংমল ও ওয়ার্ড কার্যালয়ের সামনে সেবা প্রদানের ঘোষণাও দিয়েছেন। নিজস্ব অর্থায়নে এই বুথ দেশের ৬৪ টি জেলায় পৌঁছে দিতে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর সহায়তা নিয়েছেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ফাউন্ডেশনের। ইতোমধ্যে দেশের ৩০টিরও বেশি জেলায় উপহার হিসেবে পৌঁছে গেছে এই বুথ। মহিউদ্দিন চৌধুরী ফাউন্ডেশনের সহায়তায় তৈরি ১ হাজার করোনা প্রতিরোধক বুথের মধ্যে ৭শ’টি ব্যবহার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

রাজশাহী, পিরোজপুর, মাদারীপুর, হবিগঞ্জ, সিলেট, ফেনী, নোয়াখালী, ঢাকা, যশোর, কুমিল্লাসহ দেশের বেশিরভাগ জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে গেছে বাবরের এই অবাক করা সৃষ্টি। শুধু তা নয়, পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ির মানুষেরা ব্যবহার করতে পারছেন এই বুথ। এই বুথ যাতে নিজেরাই তৈরি করে ব্যবহার করতে পারে সেই সুবিধার্থে ‘করোনা প্রতিরোধক বুথ’ তৈরির প্রক্রিয়া ভিডিও করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দেশের প্রতিটি শহর-গ্রাম, পাড়া-মহল্লায়। এই প্রচেষ্টা সফলও হয়েছে।

রাজশাহীতে ২টি বুথ উপহার পাঠানোর পর স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা তাদের নিজদের অর্থায়নে ৩০টি বুথ তৈরি করে ছড়িয়ে দিয়েছেন জেলার আনাচে-কানাচে। জানা গেলো, দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এই বুথ। ‘করোনা প্রতিরোধক বুথ’ তৈরির প্রক্রিয়া ভিডিও দেখে ভারতের কলকাতা, বারাসাত এবং চীনের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে সহযোগিতার অনুরোধ করা হয়েছে। তারা এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিজেদের দেশে আরো উন্নতভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহার করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

শহর, জেলা, দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে জনপ্রিয়তা পাওয়া করোনা-প্রতিরোধক বুথ তৈরির স্বপ্নদ্রষ্টা বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন করোনা প্রতিরোধক বুথের শুরু থেকে শেষের গল্প। বুথ তৈরীর ধারণা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শহরে এমন বহু নিম্নবিত্ত মানুষ আছে টাকা দিয়ে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে অক্ষম। এই কারণেই তারা মাস্ক ব্যবহার করতো না। কিন্তু তাদেরই করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আমি চাচ্ছিলাম তারা যাতে প্রতিনিয়ত মাস্ক-স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারে। মনে হলো একটা নির্দিষ্ট স্থানে তারা যখন প্রয়োজন এগুলো যাতে ব্যবহার করতে পারে এমন কিছু তো আমি করতে পারি।’

‘মাথায় আসলো এটিএম বুথে যেভাবে মানুষ টাকা তুলতে পারে সেভাবে যদি মাস্ক-স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারে তাহলে কেমন হয়! কার্পেন্টারকে ডেকে এটিএম বুথের আদলে একটি বক্স বানাই, যেখান থেকে একদিকে বিনামূল্যে মাস্ক নিতে পারবেন, সেই সঙ্গে দুই হাতও স্যানিটাইজ করে নিতে পারবেন। ব্যবহৃত পুরোনো মাস্ক ফেলার জন্য একই বক্সে একটি ডাস্টবিনও রাখি। তারপর নগরের বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এগুলো স্থাপন করি।’- যোগ করেন বাবর।

হেলাল আকবর বাবর বলেন, ‘শুরুর দিকে নিজেই এই বুথ স্থাপন করলেও এটি পুরো চট্টগ্রামে ছড়িয়ে দিতে আমি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ফাউন্ডেশনের সহায়তা নেই। যদিও এই প্রচেষ্টায় বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের আক্রোশের শিকার হয়ে কিছুটা থমকে যেতে হয়েছে আমাকে। তাই আমার বা ফাউন্ডেশনের ছবি ব্যবহার ছাড়াই এই বুথের সংখ্যা বাড়াতে থাকি। কারণ নিজেদের প্রচার নয়, মানুষকে বিনামূল্যে এই সেবা দেওয়াই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।’

‘আমার মনে হলো এই বুথ সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। দেশে এমন অনেকে আছে, যারা বিনামূল্যে এগুলো পেলে ব্যবহার করবে, করোনাসংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকবে। এভাবেই সারাদেশে এই বুথ ছড়িয়ে দেওয়ার ভুত চেপে বসে মাথায়। ফাউন্ডেশনের ব্যানারে টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই বুথ ছড়িয়ে দিতে থাকি প্রতিটি জেলায়।’- বলেন হেলাল আকবর।

এক প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলমের নির্বাচনী এলাকা রাজশাহীর চারঘাটেও মহিউদ্দিন চৌধুরী ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমি এই বুথ পাঠিয়েছি। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসব করোনা প্রতিরোধক বুথ পাঠিয়ে অনুরোধ করেছি যদি সম্ভব হয় এমন আরও বুথ তৈরি করুন। তারা আমাদের এই অনুরোধ রেখেছেন। আমাদের পাঠানো এসব বুথের মত আরো বেশ কিছু বুথ তৈরি করে নিজেদের এলাকায় স্থাপন করেছেন।’

বাবর বলেন, ‘দেশের হাসপাতালগুলোতে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের মাধ্যমে ডাক্তারেরা যদি করোনা রোগীর সংস্পর্শে এসে নিজে সুস্থ থাকতে পারেন, তাহলে আমরাও আমাদের স্বাভাবিক জীবনে এগুলোর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে করোনার সঙ্গে লড়াই করতে পারবো।’

বাবরের অনুরোধ, ‘আপনারা আমাদের এই করোনা-প্রতিরোধক বুথ ব্যবহার করুন। সামর্থ থাকলে নিজ উদ্যোগে এ ধরনের বুথ তৈরি করে নিজেদের এলাকায় স্থাপন করুন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা করোনা মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো বলে আমার বিশ্বাস।’

করোনা প্রতিরোধক বুথ তৈরি করবেন যেভাবে

যে কোনো কার্পেন্টারের সাহায্যে পিসবোর্ড দিয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকায় একটি বুথ তৈরি করা যাবে। যদি বুথকে স্টিকার দিয়ে সজ্জিত না করা হয় তাহলে এই কাজ করা যাবে মাত্র ৮ হাজার টাকায়। প্রতিটি বুথ থেকে প্রায় ৮ শতাধিক মানুষ এই সেবা নিতে পারবেন। প্রতিবার মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার রিফিল করতে খরচ হবে প্রায় ১২শ’ টাকা।