বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

চাকচিক্যময় ‘স্মার্ট জেলখানার’ ঈদের গল্প

প্রকাশিতঃ রবিবার, জুলাই ২৫, ২০২১, ৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ


ওমর ফারুক হিমেল : এবারের ঈদ আমার জন্য আনন্দ ও সীমাহীন আহ্লাদের। কিন্তু গত ২১টি ঈদ ছিল আনন্দ আর সুখানুভূতিহীন। কারণ প্রবাস জীবন কেড়ে নিয়েছিল আনন্দের ফোয়ারা। প্রত্যেক ঈদের রয়েছে অনন্য আমেজ। বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা স্বদেশে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদ করেন। গত ঈদগুলো আমার কেটেছিল প্রবাস নামক চাকচিক্যময় মনোরম জেলখানায়। অভিজ্ঞতা বলছে, প্রবাস আর দেশে ঈদ পালনের মধ্যে রয়েছে অনেক ফারাক।

পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে দেশে ঈদ করার আনন্দটাই আলাদা। করোনাকালে প্রবাসীদের ঈদ সত্যি নিরানন্দের, আর হৃদয়টা হোম সিকনেসের আঁধার।। অনেকের চাকরি নেই, কেউ কেউ স্বজনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দে শামিল হতে দেশে আসতে পারেননি। কেউ কেউ বেতন না পাওয়া কোরবানি দিতে পারেননি।

বিজ্ঞান বলছে, একজন সাধারণ মানুষ ব্যথা সহ্য করতে পারে সর্বোচ্চ ৪৫ ইউনিট ডেল। অন্যদিকে একজন মা প্রসব ব্যথা সহ্য করেন ৫৭ ইউনিট ডেল পর্যন্ত। সন্তান প্রসবের জন্য মায়েদের এ ত্যাগ-তিতিক্ষা অসহনীয়, অবর্ণনীয়। একজন মা ছাড়া এ ব্যথার অনুভূতি কিংবা প্যারামিটার সাধারণ মানুষ অনুধাবন করতে পারে না, পারবে না।

একইভাবে একজন প্রবাসীর পরবাসের অনুভূতি কেমন, যে কখনো প্রবাসের কঠোর শৃঙ্খল দেখেনি, তার পক্ষে অনুধাবন করা কষ্টের। দেশে বসে সুন্দর সুন্দর গল্পের ইতি টানা যায়, নানা ফিরিস্তি তোলা যায়, কিন্তু প্রবাসের অনুভূতি নেওয়া যায় না। প্রবাসীদের কষ্টের হৃদয় দহন অনুভব করা যায় না।

প্রত্যেক প্রবাসীর রয়েছে অব্যক্ত কিছু কথা। এ যেন সংগ্রামী জীবনযুদ্ধের একেকটি উপাখ্যান। প্রবাসীরা চাপা রাখেন নিজেদের কষ্ট, হৃদয়ের কান্না। তারা ছোট ছোট সুখগুলো পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করেন। কষ্টগুলো হৃদয়ে পুঁতে রাখেন। ভবিষ্যৎ জীবন উজ্জ্বল করার আশায়, নিজের জীবনকে, পরিবারকে সুখে রাখার আশায় ছন্দময়, বর্ণময়, আনন্দময় দিনগুলোকে হাসিমুখে কবর দেন তারা।

চেইন অব কমান্ডের দেশ কোরিয়ায় আজব এক ঈদের অনুভূতি রয়েছে আমার ও কোরিয়া প্রবাসীদের। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ঈদের ছুটি থাকে, কিন্তু কোরিয়ায় কোম্পানি থেকে ছুটি নেওয়া অনেক কঠিন কাজ। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পরিবর্তন এসেছে। ২০২০ সালের শেষ দিকে আমি কোরিয়ার প্রবাস জীবনের ইতি টানি।

উচ্চতর ডিগ্রির জন্য জার্মানিতে যাই। জার্মানিতে কয়েকমাস অবস্থানের পর এবার দেশে ঈদ করতে আসা। তবে জার্মানিতে ঈদের স্মৃতি না থাকলেও কোরিয়ার আছে ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহা মিলে ২১টি ঈদের দিনলিপি। কিন্তু দেশে এসে এবারই ঈদের প্রাণখোলা স্বাদ পেয়েছি। বলা বাহুল্য, যা কোরিয়ায় পাইনি।

ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ডিউটির আগে ঈদের নামাজ পড়তাম। অনেকের কাছাকাছি মসজিদ না থাকায় নামাজও পড়তে পারেন না। পরিবারের জন্য ঈদের টাকা পাঠাতে পারলেই প্রবাসীদের হৃদয় আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে। ঈদে পরিবারের মুখে হাসি দেখলে প্রবাসীরা আনন্দে বিভোর হয়ে যান। ঈদের সারাদিন প্রবাসীর মনটা পড়ে থাকে পরিবারের কাছে। প্রবাসে প্রত্যেক প্রবাসীর কর্মব্যস্ততার মাঝেও মনটা থাকে দেশে।

এতো কিছুর পরও প্রবাসীদের জীবন চলে নিরন্তর। লক্ষ্যের পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন এ যোদ্ধারা। এ জীবনে যখন তারা ব্যর্থতার তিক্ত স্বাদ পায় তখন চোখ বুজে সয়ে যায়। ঝিনুক নীরবে সহে, ঝিনুক নীরবে সহে যায়, হাসিতে মুক্তা ফলায়।

লেখক : সাংবাদিক