শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

রাত পোহাবার কতো দেরি?

প্রকাশিতঃ রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১, ২:২১ অপরাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী : ‘আমরা বেশ দীর্ঘসময় ধরে কথা বলতে পারি। অর্ধ শতাব্দী আগে জাতিসংঘে কৃষ্ণ মেননের একটানা নয়ঘণ্টা বক্তৃতার রেকর্ড এখনও পর্যন্ত কেউ কোথাও ছুঁতে পারেননি। অন্যান্য ভারতীয়রা বাগ্মিতায় আরও অনেক চূড়া স্পর্শ করেছেন। আমরা কথা বলতে ভালোবাসি। এটি কোনো নতুন অভ্যাস নয়। রামায়ণ মহাভারতকে প্রায়ই গ্রিক মহাকাব্যদ্বয় ইলিয়াড ও ওডিসির সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু সংস্কৃত মহাকাব্য দুটির বিশাল দৈর্ঘ্যের তুলনায় অনতিউচ্চাশী হোমারের রচনা দুচিকে বেশ সংক্ষিপ্তই মনে হয়। ইলিয়াড ও ওডিসি যোগ করলে যা দাঁড়ায় শুধুমাত্র মহাভারতের দৈর্ঘ্যই তার সাতগুণ।

রামায়ণ ও মহাভারত নিশ্চিতভাবে মহান দুটি মহাকাব্য। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আমি স্মরণ করি কীভাবে একদিকে মননগত উদ্দীপনা ও অন্যদিকে নিছক আনন্দ পাওয়ার জন্য অধীর এক বালক হিসাবে রামায়ণ ও মহাভারত আমাকে সমৃদ্ধ করেছিল। মূল গল্পকে কেন্দ্র করে এগুলো কিন্তু এগিয়েছে কাহিনীর পর কাহিনীতে। নানান আলাপ আলোচনা, সংকট ও বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিতে ভরা এই কাহিনীগুলো। সেই সঙ্গে এগুলোতে আমরা সম্মুখীন হই বিরামহীন বিতর্ক ও মতবিরোধের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির প্রয়োগের’। লেখার এই অংশটি আমার নয়। বিরল মেধাচারী অমর্ত্য সেন-এর গ্রন্থ ‘তর্কপ্রিয় ভারতীয়’ থেকে নেওয়া। যেটি অনুবাদ করেছেন কুমার রাণা।

তর্ক আছে বলেই না নতুন সৃষ্টি। নতুন সম্ভাবনা। প্রশ্ন আসে বলেই না সভ্যতার অগ্রযাত্রা। সেই বহুল পঠিত নিউটনের আপেলের কথাই যদি বলি। তাঁর মনে প্রশ্ন এসেছিল বলেই না মধ্যাকর্ষণ শক্তির উৎপত্তি। নইলে আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো আপেল খেয়ে কাপড়ে হাত মুছে ফেললেই সারা।

কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভগবানের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, ‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো/তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?’ সুকুমার রায়ের বিষম চিন্তা ছিল নানা প্রশ্ন নিয়ে। তাই তিনি লিখেছেন?

‘মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার-সবাই বলে, মিথ্যে বাজে বকিস নে আর খবরদার!’ তিনি ভেবেছিলেন বড় হলেই কেতাবে বুঝি মিলবে সব প্রশ্নের জবাব। সত্যি কি সব প্রশ্নের জবাব কেতাবে মেলে?
তাহলে তো প্রতীক্ষায় থাকা সুনীলকে একের পর এক চন্দ্রভূক অমাবশ্যা পার করতে হতো না। অন্তরাটুকু শোনার জন্য অপেক্ষা করতে হতো না বৈষ্টুমির জন্য। কিংবা মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলীকে আক্ষেপ করে বলতে হতো না, ‘আমি আর কতো বড় হবো?’ বরুণা বা নীরার জন্য সুনীলের অপেক্ষা হয়তো আর শেষ হবে না।

সুনীল এখন আকাশের তারা। আর কে না জানে নক্ষত্রের পতন হলেও তারারা কখনো জীবিত ফিরে না। তবুও জেমসের মতো কেউ হয়তো রাতের তারাকে প্রশ্ন করেন, ‘রাতের তারা আমায় কি তুই বলতে পারিস? কোথায় আছে, কেমন আছে মা?’ কারণ তিনিও শুনেছিলেন ‘সবাই বলে ঐ আকাশে লুকিয়ে আছে, খুঁজে দেখো পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে’। তারার কথা যখন উঠলই মনে পড়ে গেল হেমন্তের সেই বিখ্যাত গান। ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা। আর কতো কাল আমি রব দিশাহারা। জবাব কিছুই তার দিতে পারি নাই শুধু পথ খুঁজে কেটে গেল এ জীবন সারা’।

মানুষের জীবনতো কেটে যায় পথ খুঁজতে খুঁজতে। সঠিক পথের নিশানা পাওয়া কি সব সময় সম্ভব। এই পথের খোঁজেই, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে করতে এগিয়ে যায় জীবন। শাহ আলমের কথায় সেই গানও তখন মনে পড়ে যায়, ‘আকাশটা কাঁপছিল ক্যান, জমিনটা নাচছিল ক্যান, বড় পীর ঘামছিল ক্যান, সেই দিন, সেই দিন?’ তিনি কোনদিনের কথা বলেছেন? হয়তো কেয়ামতের দিন, হয়তো জীবনের কঠিন কোনোদিন। এমন দিনতো প্রতিটি মানুষের জীবনেও আসে বারবার। তখন নিজেকে স্থির থাকতে হয়। শক্ত থাকতে হয়। কিন্তু জীবন আসলে এমন। এই বলাটা যতোটা সহজ প্রয়োগ ততোটাই কঠিন। অন্যকে বলা যায় কিন্তু নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে গেলেই মনে অন্য চিন্তা আসে। মনে হয়, ‘নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে।

সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে, এই যে বেঁচে ছিলাম-দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয় সবাইকে’। কিংবা যারা বেঁচে থেকে হারিয়ে ফেলেছেন অনেক কিছুই। সেই হারিয়ে যাওয়ার বেদনা থেকে, সেই হারিয়ে যাওয়া সময়টা ফিরিয়ে আনতে গিয়ে, ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠতে গিয়ে কেউ কেউ হয়তো গেয়ে উঠেন, ‘এতদিন পরে প্রশ্ন জাগে, শুধুই কি হেরেছি আমি? হৃদয় ভাঙার সেই নিপুণ খেলায়, একটু কি হারোনি তুমি?’ আহারে হারজিত!

একটা সময়ে হেরে যাওয়ার প্রতিশোধ নিতে খুব ইচ্ছে হতো। এখন আর করে না। হয়তো ভালো কিছু মানুষের সান্নিধ্য বা মহাপুরুষদের লেখা পড়ে পড়ে এমন হয়েছে। অথবা শরীরের বয়স বাড়ছে। কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। প্রতিশোধতো নয়ই। শুধুই সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ক্ষমা করতে ইচ্ছে করে। নীরবতাই হয়তো প্রকৃতির বড় প্রতিশোধ।

সেই গানের কথা মনে পড়ে, ‘হারজিত চিরদিন থাকবেই, তবুও এগিয়ে যেতে হবে/বাধা বিঘœ না পেরিয়ে…বড় হয়েছে কে কবে’। আকাশের কাছে, সাগরের কাছে প্রকৃতির বিশালতার কাছে নিজেকে সঁপে দেই। এতে নিজের ক্ষুদ্রতিবোধ সম্পর্কে সজাগ হই। অহঙ্কার চূর্ণ হয়। আমি আর একফালি নিষ্পাপ চাঁদ সারারাত কথা বলি। ব্যালকনি থেকে মাঝে মাঝে ফুলের গন্ধ আসে। ঘুম আসে না।

যতীন্দ্রমোহন বাগচীর মতো মায়ের কাছে জানতে ইচ্ছে করে, ‘বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?’ কাজলা দিদির কথা জানা হয় না। প্রযুক্তির কল্যাণে যাকে যতোটা জানি সেটা ফেসবুকে। অথচ বুকে-হৃদয়ে ধারণ করে আছে কতো শত জন। তাঁদের আর দেখা পায় না। তবুও জীবন যাচ্ছে কেটে জীবনের নিয়মে। সেই জীবনে সাফল্য আছে, ব্যর্থতা আছে, বলার মতো গল্প আছে, হারিয়ে যাওয়ার বেদনা আছে। জীবনের জয়ভেরী যখন ডুবতে থাকে, সামনে যখন থাকে অসীম কুয়াশা তখনই অসহ্য জীবন বয়ে চলা কারো কারো প্রশ্ন থেকে যায় কবি ফররুখ আহমদ এর মতো, ‘রাত পোহাবার কতো দেরী পাঞ্জের?’

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক