শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

সবচেয়ে ভালো খেতে গরীবের রক্ত

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১, ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ


শান্তনু চৌধুরী : মরিচ, পেঁয়াজ বা লঙ্কা দিয়ে পান্তাভাত, সাথে আলু ভর্তা বা ডিম ভাজি দিয়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতা গ্রামে বেড়ে ওঠা সকলের কম বেশি রয়েছে। বাংলাদেশে মোশাররফ করিম অভিনীত জনপ্রিয় নাটক ‘যমজ’ এর প্রায় প্রতিটি পর্বে ‘নেকাব্বর’ চরিত্রে অভিনয়কারী হাবাগোবা মোশাররফ প্রায় গামলা ভর্তি পান্তা খান। খেয়ে খেয়ে এমন অবস্থা হয়, তার পিতা আরেক মোশাররফ করিম ওরফে ‘কদু আজাদ’ নেকাব্বরকে খোঁটা দেন, ‘ঝোলা ভর্তি করে খাও বাজান’। তবে সকালে ঝোলা মানে পেটভর্তি পান্তা খেয়ে যারা গ্রামে কাজে বেরিয়ে পড়েন তাদের দুপুর অব্দি খিদা লাগে না বললেই চলে। পান্তার এমন গুণ।

সম্প্রতি বাংলাদেশী বংশদ্ভুত কিশোয়ার চৌধুরী যে এই পান্তা নিয়ে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন সেকথা সকলে জানেন। মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া প্রতিযোগিতার ফাইনালে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই নারী পান্তা ভাত তৈরি করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন। কেউ ভাবতেও পারেননি যে, রান্নার এরকম একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পান্তা ভাতের মতো একটি আটপৌরে খাবার পরিবেশন করা যায়।

এই পান্তা ভাতের ওপরেই গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীদের একটি দল। ভারতের আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়, যাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন কৃষি জৈব প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মধুমিতা বড়ুয়া। এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল পান্তা ভাতে কী আছে এবং এসব উপাদান শরীরের জন্য কতোটা উপকারী বা অপকারী সেগুলো খুঁজে বের করা। গবেষণার ফলাফল পরে এশিয়ান জার্নাল অব কেমিস্ট্রিতে প্রকাশ হয়েছে। পান্তা ভাত নিয়ে সম্ভবত এটাই একমাত্র বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

তবে মধুমিতা বড়ুয়া জানিয়েছেন, তাদের এই গবেষণা এখনও চলছে। তারা এখন জানার চেষ্টা করছেন, পান্তা ভাত ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য ভালো না খারাপ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেসব অঞ্চলে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয় এবং যেসব দেশে ভাত প্রধান খাবার, মূলত সেসব দেশে ভাত পানিতে ভিজিয়ে খাওয়ার সংস্কৃতি চালু আছে। এসব এলাকার আবহাওয়া অত্যন্ত গরম এবং আর্দ্র হওয়ার কারণে খুব সহজেই ভাত নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু পানিতে ভিজিয়ে রাখার কারণে এই খাবার দ্রুত নষ্ট হয় না।

গবেষণায় দেখা গেছে, পান্তা ভাতে নানা ধরনের মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট বা পুষ্টিকর খনিজ পদার্থ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, জিংক, ফসফরাস, ভিটামিন বি ইত্যাদি। বৈশাখে আমাদের দেশে পান্তার সাথে যোগ হয় ইলিশ। আর কিশোয়ার সেখানে কাজ সেরেছিলেন সার্ডিন মাছ ভাজা দিয়ে (দেখতে অনেকটা ইলিশের মতো)। যা উল্টে-পাল্টে খেয়েছিলেন বিচারকরা। তবে পান্তার সাথে ডিম ভাজিরও একটা আলাদা সম্পর্ক রয়েছে। পেঁয়াজ, মরিচ বেশি দিয়ে ডিমভাজির সাথে পান্তার স্বাদ অতুলনীয়।

এবার ডিমভাজি নিয়ে একটা মজার ঘটনা বলা যাক। ফ্রান্সে জায়ান্ট অমলেট ফেস্টিভ্যাল নামে এক উৎসব হয়ে থাকে। উৎসবটির একটি ইতিহাস আছে। বলা হয়ে থাকে, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট একবার ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে যাওয়ার পথে বেসিয়েরেসে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেখানকার এক পান্থশালার মালিকের হাতে বানানো ডিম ভাজি (অমলেট) খেয়ে তিনি এতই তৃপ্তি পেয়েছিলেন যে, পরের দিন শহরের সব ডিম নিয়ে আসার আদেশ দেন। তার কথামতো যত ডিম ছিল, সব নিয়ে এসে নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনীর জন্য বিশাল এক অমলেট বানানো হয়েছিল। এখন পর্যন্ত বেসিয়েরেস সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

ইস্টার সানডেতে তারা ১৫ হাজার ডিম দিয়ে বানায় বিশাল আকৃতির অমলেট। কয়েকশ’ মানুষ এই উৎসবে রান্নায় দায়িত্বে থাকেন। আর উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষেরা বিশাল অমলেটের খানিকটা অংশ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। ফ্রান্সের আরও কয়েকটি শহরে নিজ উদ্যোগে অনেকেই অমলেট ফেস্টিভ্যাল করে থাকে। যার মধ্যে অন্যতম লুইসিয়ানা ও আবেভিল। প্রতি বছরের অক্টোবরে ৫ হাজার ডিম দিয়ে উৎসবের প্রস্তুতি নেয় তারা। খাবার নিয়ে পৃথিবীতে এমন নানা উৎসব হয়ে থাকে। বাঙালিদের রসনা নিয়েও উৎসব কম নয়।

এই ফাঁকে রবীন্দ্রনাথের এক গল্প ঝেড়ে দেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষটি একেবারেই রাশভারী ছিলেন না, বরং বেশ রসিক ছিলেন বলেই জানা যায়। একবার রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজি একসঙ্গে খেতে বসেছিলেন। গান্ধীজি লুচি খেতে ভালোবাসতেন না, তাই তাঁকে ওটসের পরিজ খেতে দেওয়া হয়। আর কবি খাচ্ছিলেন গরম গরম লুচি। এটা দেখে গান্ধীজি তাঁকে বললেন, ‘গুরুদেব তুমি জানো না যে তুমি বিষ খাচ্ছো’। এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বিষ হবে, তবে এর অ্যাকশন খুব ধীরে, আমি বিগত ষাট বছর যাবৎ এই বিষ খাচ্ছি’।

সকলের প্রিয় শিবরাম চক্রবর্তীর রচনায় তো প্রায়ই খাদ্য সংক্রান্ত রসিকতা চোখে পড়ে, বিশেষত তাঁর ‘হর্ষবর্ধন’ রচনাগুলিতে। হর্ষবর্ধনের মোটেই খাবার হজম হয় না, তাঁর গিন্নী খুবই চিন্তায় আছেন। প্রতিদিন গাঁদাল পাতার ঝোল রান্না করেন স্বামীর জন্য। কবিরাজ বড়িও দিয়েছেন। এদিকে সেই হজমের বড়ির গুণ এতোই প্রবল যে পেটের নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাওয়ার যোগাড়। শেষ পর্যন্ত হর্ষবর্ধনকে দু’বেলা পাইস হোটেলে খেয়ে পেট বাঁচাতে হয়। নিজের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পর্কিত একটি হাস্যরসাত্মক গল্পে খাবার নিয়ে অনেক মজার কথা লিখেছেন লেখক। এমন আরো অনেক রচনা আছে তাঁর। আরেকজন প্রখ্যাত লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর অনেক গল্পে খাবার সম্পর্কিত বিভিন্ন মজার কথা লিখেছেন। তাঁর রচিত ‘বাছাই গল্প’ বইটি আগ্রহী পাঠকরা পড়ে দেখতে পারেন।

চট্টগ্রামের বেলা বিস্কুটের ঐতিহ্য ও স্বাদের কথা মানুষের মুখে মুখে। বেলা বিস্কুট দিয়ে চা একটা মজাদার খাবার বটে। আমেরিকানরাতো নানা বিষয়ে গবেষণা করে থাকেন। সম্প্রতি তারা গবেষণা করেছেন বিস্কুট নিয়ে। জরিপে উঠে এসেছে ৮৩ শতাংশ মানুষ সঙ্গীকে নিয়ে ঘোরার চেয়ে চায়ের সঙ্গে বিস্কুট খেয়ে সময় কাটাতে বেশি ভালোবাসেন। আমাদের দেশের বিবেচনায় তথ্যটির বাস্তবতা যা–ই হোক না কেন, বিস্কুট যে মানুষের প্রিয় একটি খাবার, তা কিন্তু অস্বীকার করা যায় না।

অতিথি আপ্যায়নে বা হালকা খিদেয় বিস্কুটের কদর জগৎজোড়া। ছোটবেলার বিস্কুট দৌড়ের কথাও মনে আছে নিশ্চয়ই। মানুষের পছন্দের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাজারে রয়েছে নোনতা, মিষ্টি, ঝাল নানা স্বাদের বিস্কুট। এই বিস্কুট বেশ পুরোনো খাবার। প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও মিসরীয় সাম্রাজ্যের সামরিক বাহিনীর সদস্য ও ব্যবসায়ীদের বছরের একটি দীর্ঘ সময় সমুদ্র বা দুর্গম অঞ্চলে কাটাতে হতো। তখন এমন একটি খাবারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যা হবে ওজনে হালকা, পর্যাপ্ত ক্যালরিসমৃদ্ধ এবং সহজে নষ্ট হয় না। বিষয়গুলোর সমন্বিত সমাধান হিসেবে উদ্ভাবিত হয় এই দারুণ খাবার।

খাবারের মধ্যে মধুই এমন এক খাবার যেটি কখনো নষ্ট হয় না। তবে খাবার নিয়ে কথা যখন উঠলোই তখন সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার সেই জমিদার ধনপতি পালের কথা মনে পড়লো। তিনি বেশি খেতে ভালোবাসতেন গরীবের রক্ত। আমাদের আশেপাশে কতো ধনপতি পাল মশার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাঁর হিসেব কে-ই বা রাখে।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক