সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

বিয়ে : বলির আগে ছোট আয়োজন

প্রকাশিতঃ সোমবার, নভেম্বর ২২, ২০২১, ২:১৬ অপরাহ্ণ


শান্তনু চৌধুরী : শীতের আমেজ মানেই চারদিকে বিয়ের আয়োজন। এই কলামে গেল সংখ্যায় নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই এর বিয়ে এবং বিয়ে নিয়ে তিনি কী বলেছিলেন সেটা লিখেছিলাম। মালালার বক্তব্য নিয়ে নেটিজনদের মধ্যে বেশ আলোচনা ও ট্রল হয়েছিল। পরে অবশ্য বিবিসি’কে মালালা নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে আরেকটি বক্তব্য দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন,‘ আমি বিয়ের বিরুদ্ধে ছিলাম না। বিয়ে নিয়ে আমার উদ্বেগ ছিল, যা বিশ্বের অনেক নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যারা বাল্যবিয়ে, জোরপূর্বক বিয়ে, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং কীভাবে পুরুষদের তুলনায় নারীদের বেশি সমঝোতা করতে হয় তা দেখেছেন’।

মালালা যাই বলুক পশ্চিমবঙ্গের জীবনমুখী গায়ক নচিকেতা বলছেন, ‘বিয়ে হলো বলির আগে ছোট্ট আয়োজন’। তবে তিনি এও বলেছেন, ‘বিয়ে করে বলেন সুখী-স্ত্রী আমার চন্দ্রমুখী’। বিয়ে নিয়ে তারাপদ রায়ের একটি কাহিনী এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, আপনি কেন বিয়ে করেননি?

এই প্রশ্নের উত্তরে সেই ভদ্রলোক বলেছিলেন এই গল্প। ‘সে অনেককাল আগের কথা। তখন আমার নবীন যৌবন। এক বিয়েবাড়িতে গেছি। মেয়েকে সাত পাক ঘোরানো হচ্ছে। ছাদনাতলায় বেশ ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যে আমি এক ভদ্রমহিলার বেনারশি শাড়ির আঁচল পা দিয়ে মাড়িয়ে ফেললাম।

মহিলা ঘুরে দাঁড়িয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগলেন, স্টুপিড, ইডিয়ট, গবেট, চোখের মাথা নেই, মুরোদ নেই, ক্যাবলা, আনস্মার্ট, ধর্মের ষাঁড়, কুম্ভকর্ণ, অন্ধ, চোখের মাথা খেয়েছ, অকর্মার ধাড়ি,’ ইত্যাদি নানা বিশেষণে আমাকে জর্জরিত করতে করতে হঠাৎ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে জিব কাটলেন, তারপর বললেন, সর্বনাশ! আমি ভেবেছি আমার স্বামী বুঝি আমার আঁচলটা মাড়িয়ে দিয়েছে। আপনি দয়া করে কিছু মনে করবেন না, স্যরি!’ গল্প শেষ করে ভদ্রলোক বললেন, আমি কিছুই মনে করিনি। বিয়েও আর করিনি!

তারকাদের বিয়ে বিষয়টাও বেশ গোলমেলে। তবে বাংলাদেশে কিছুটা রক্ষণশীল হওয়ায় খুব বেশি আলোচনায় আসে না। যেমনটি হলিউড বা বলিউডে আসে। এই যেমন, এখন ক্যাটরিনা ও ভিকি কৌশলের বিয়ের বিষয় বেশ আলোচনায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সালমান খান বিয়েতে দাওয়ার পাবেন কি পাবেন না তা। আমাদের সাধারণ পরিবারেও অবশ্য বিয়ের দাওয়াত পাওয়া, না পাওয়া নিয়ে মান অভিমান থেকে শুরু করে এটা নিয়ে নানা আলোচনাও আছেই! তবে আম পাবলিকের বিষয়ে কার কি এসে গেল! বলিউডের ঐশ্বরিয়ার সৌন্দর্যের কথা জানে পুরো বিশ্ব। তাকে মন দেয়া নেয়ায়, অনেক তারকার তালিকা থাকলেও সালমান খানের সঙ্গে তার প্রেমের খবর ওপেন সিক্রেট। ঐশ্বরিয়ার সাথে বিবেক ওবেয়রের একটু ঘনিষ্টতা ছিল কিন্তু তার বিয়ে হয় বিগ বচ্চনপুত্র অভিষেক বচ্চনের সঙ্গে।

অভিষেকের সাথে প্রেম ছিল কারিশমা কাপুর ও রানী মুর্খাজির। পরে রানী মুখার্জি বিয়ে করেন আদিত্য চোপড়াকে। এরপর সালমানের প্রেম হয় ক্যাটরিনার সাথে। কিন্তু ক্যাটরিনা প্রেমে পড়েন রানবীরের। রানবীর আবার দীপিকার বয়ফ্রেন্ড। এদিকে ক্যাটরিনা আবার রানবীরকে ছেড়ে চলে আসে সালমানের কাছে। দীপিকা যায় রানবীর সিংয়ের কাছে। যার আগের গার্লফেন্ড ছিল আনুশকা শর্মা, যিনি এখন বিরাট কোহেলীর বউ। সালমান এখন সিঙ্গেল। মাঝে মাঝে জ্যাকলিন, লুলিয়া ভেন্তুর, জেরিন আর ডেইজি শাহের সাথে টাইম পাস করেন। রানবীর সামনে হয়তো আলিয়া ভাটকে বিয়ে করবেন। আলিয়া আবার ছিলেন সিদ্ধার্থের গার্লফ্রেন্ড, কিন্তু সিদ্ধার্থ এখন ডেট করছেন কিয়ারা আদাভানীর সঙ্গে।

বিয়ে নিয়ে যখন লিখছি তখন মজার তথ্যতো দিতেই হবে। তিউনিসিয়ার তরুণীরা বিয়ের আগে কুমারীত্ব নিশ্চিত করতে চান। তাই তাঁরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাইমেন বা সতীচ্ছেদ পর্দা প্রতিস্থাপন (হাইমেনোপ্লাস্টি) করে থাকেন। দিন দিন এর চাহিদা বেড়েই চলেছে। ফলে দেশটির চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে এই অস্ত্রোপচারের ব্যবসা। হাইমেন হলো একধরনের পর্দা, যা নারী-অঙ্গ আংশিকভাবে বন্ধ রাখে। এর উপস্থিতিকে তিউনিসীয় সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে কুমারীত্বের চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিউনিসিয়ায় কুমারীত্ব নিয়ে স্বামীর সন্দেহের কারণে বিয়ের পরপরই বিচ্ছেদের ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে থাকে।

চিকিৎসকরা জানান, ৯৯ শতাংশ রোগীই তাঁদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের কাছে লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়ার হাত থেকে বাঁচতে এই অস্ত্রোপচার করে থাকেন। বহু নারী তাঁদের কুমারীত্ব হারানোর বিষয়টিকে আড়াল করতে চান। তবে শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াও অন্য অনেক কারণে সতীচ্ছেদ ছিঁড়ে যেতে পারে। আর এখানে সেটা হলেও নারীরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কারণ, বিয়ের আগেই তাঁদের যৌন সম্পর্ক হয়েছে বলে মিথ্যা ধারণা তৈরি হয়। উত্তর আফ্রিকায় নারী অধিকারের দিক থেকে তিউনিসিয়াকে শীর্ষস্থানীয় দেশ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তবে ধর্ম এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী এখানকার তরুণীদের বিয়ের আগ পর্যন্ত কুমারী থাকতে হবে। বিয়ের পর কোনো নারী কুমারী নন—এটা প্রমাণিত হলে তিউনিসীয় আইন অনুযায়ী ওই নারীর স্বামী তাঁকে তালাক দিতে পারেন।

বাঙালি মা-বাবারা তাদের ছেলেদের বউ দেখে যেতে চান, এটি চিরন্তন। মেয়ের পিতা-মাতাও চান উপযুক্ত পাত্রে হস্তান্তর। অবশ্য এই ধারণাটি বেশ প্রাচীন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। সনাতন হিন্দু জীবনধারায় শ্রীকৃষ্ণ ‘পরমপুরুষ’ হিসেবে বিবেচিত। কৃষ্ণজীবনকথা বলতে আমরা আজ যা বুঝি, তা কোনও একটি মাত্র গ্রন্থ থেকে পাওয়া নয়। ‘মহাভারত’-এ কোথাও কৃষ্ণের বাল্যলীলার উল্লেখ নেই। কৃষ্ণকে ‘মহাভারত’-এ প্রথম দেখা যায় দ্রৌপদীর স্বয়ংম্বর সভায়। তিনি তখন পূর্ণ যুবক। কৃষ্ণের বাল্যলীলা থেকে অন্তিম লীলা পর্যন্ত ঘটনাকে এক করে ‘শ্রীমদ্ভাগবৎ’। সেখানে কেবল ভগবান শ্রীকৃষ্ণই লভ্য নন, সেই মহাগ্রেন্থে খোঁজ পাওয়া যাবে এক মানুষ শ্রীকৃষ্ণেরও।

কৃষ্ণের জীবন নিয়ে ভাবতে বসলে একটা প্রশ্ন জাগেই, সেটা হল— কী হয়েছিল কৃষ্ণের পালিকা মা যশোদা ও পালক পিতা নন্দরাজার? এর উত্তর দেয় ‘শ্রীমদ্ভাগবৎ’। সেখানে ‘মহাভারত’-এর কৃষ্ণকে আবার ফিরিয়ে আনা হয় গোকুলে-বৃন্দাবনে। কৃষ্ণ ফিরে আসেন তাঁর ছেলেবেলার লীলাভূমিতে। তার আগে অবশ্য নন্দ ও যশোদার সঙ্গে যাদবদের সাক্ষাতের কথা ‘শ্রীমদ্ভাগবৎ’ জানিয়েছিল। কুরুক্ষেত্র যাত্রার পথে কৃষ্ণও যাদবদের সঙ্গে ছিলেন। সে ছিল এক আবেগঘন পুনর্মিলন। এর পরে আরও একবার কৃষ্ণ ফিরে এসেছিলেন তাঁর পালিকা মাতা যশোদার কাছে।

‘শ্রীমদ্ভাগবৎ’ মতে, তখন যশোদা তাঁর শেষ শয্যায়। কৃষ্ণ গিয়ে দাঁড়ান তাঁর পাশে। যশোদা জানান, তাঁর কৃষ্ণের প্রতি অভিযোগ রয়েছে। কৃষ্ণ জানতে চান, কী সেই অভিযোগ। মা জানান, তিনি কৃষ্ণের কোনও বিবাহের সময়েই উপস্থিত থাকতে পারেননি। কৃষ্ণের বিবাহানুষ্ঠান দেখতে না পারাটাই তাঁর সব থেকে বড় আক্ষেপের বিষয়। এর উত্তরে কৃষ্ণ বিচলিত হন। তিনি যশোদাকে কথা দেন, এ জন্মে তাঁর সাধ পূরণ না হলেও পরের জন্মে তা অবশ্যই হবে। তিনি বকুলদেবী হিসেবে জন্মগ্রহণ করবেন এবং নারায়ণের অবতার বেঙ্কটেশ্বেরের বিবাহকে প্রত্যক্ষ করবেন। কৃষ্ণের কথায় যশোদা নিশ্চিন্তে চোখ বুঝেছিলেন কিনা জানা নেই। তবে এই কাহিনি যে মাতা-পুত্রের মধ্যেকার এক চিরন্তন আশা-নিরাশার কাহিনি, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক