রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

আমাদের টেলিভিশন ও একজন তথ্যমন্ত্রী

প্রকাশিতঃ ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ | ৫:০৫ অপরাহ্ন


খ ম হারূন : একুশে পত্রিকার সাথে পরিচয় বন্ধু সাংবাদিক আজাদ তালুকদার এর মাধ্যমে। তিনি এই পত্রিকা ও নিউজ পোর্টালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। একুশে পত্রিকা প্রথমেই আমাকে আকৃষ্ট করে, সংবাদ পরিবেশনের আধুনিকতা, নিরপেক্ষতা এবং মেদহীন বৈশিষ্ট্য যার অন্যতম কারণ। ঢাকার বাইরে থেকেও (চট্টগ্রাম) যে আধুনিক একটি পত্রিকা প্রকাশ করা সম্ভব তার উদাহরণ একুশে পত্রিকা।

এই পত্রিকার সম্পাদক ম-লীর সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা ড. হাছান মাহমুদ। ছিলেন বলছি এই কারণে যে, ভদ্রলোক যখন তথ্যমন্ত্রী হলেন তখন তিনি নিজে পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদ থেকে সরে আসেন। তথ্যমন্ত্রী হিসেবে তার নিরপেক্ষতা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় সে কারণে।

ড. হাছান মাহমুদ অত্যন্ত ভদ্র একজন মানুষ। কম কথা বলেন। কিন্তু যা বলেন তা নিজ বিশ্বাস থেকেই বলেন। তার নিরপেক্ষতার আরেকটি উদাহরণ দেই। যখন তিনি মন্ত্রী ছিলেন না, তখন ‘গ্রীন টিভি’ নামে একটি টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করার অনুমোদন পান সরকারের কাছ থেকে। এই চ্যানেলের জন্য আমি নিজেও কাজ করতে আগ্রহী ছিলাম মূলত আজাদ তালুকদার এর অনুরোধে। তার সাথে এই সূত্রে কয়েকবার ড. হাছান মাহমুদ এর ধানমন্ডির বাসাতেও গিয়েছি। কাজ যখন অনেক এগিয়ে গেছে তখন হাছান মাহমুদ সাহেব তথ্যমন্ত্রী হয়ে যান। এরপর তিনি আর এই টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আগ্রহী থাকেন না। আমারও আর কাজ করা হয় না। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন সকল টিভি চ্যানেলের যিনি অভিভাবক তিনি কীভাবে একটি চ্যানেলের কর্ণধার হতে পারেন। তার এই ভাবনাকে শ্রদ্ধা না করে উপায় নেই।

ড. হাছান মাহমুদ’কে আমি দু’বার বিদেশে বেশ কাছ থেকে দেখেছি। একবার কোপেনহেগেন, ডেনমার্কে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে। তিনি তখন পরিবেশমন্ত্রী। পরিবেশ বিষয়ে তার পাণ্ডিত্য আমাকে মুগ্ধ করে। আরেকবার বেশ কয়েকদিনের জন্য কম্বোডিয়ার সিম রিপে ২০১৯ সালের জুন মাসে। এশিয়া-প্যাসিফিক ব্রডকাস্ট সম্মেলনে। তখন তিনি তথ্যমন্ত্রী। সেখানে বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশের তথমন্ত্রী, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনসহ অনেক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। সেখানেও দেখেছি ড. হাছান মাহমুদ তার অসাধারণ বক্তব্যে মঞ্চ আলোকিত করে রেখেছেন।

আমাদের দেশে তথ্যমন্ত্রী হিসেবে খুব সফল তথ্যমন্ত্রীর নাম খুঁজতে হলে বেশ কষ্ট হবে। কিন্তু ইদানীং সময়ে ড. হাছান মাহমুদকে দেখেছি বেশ কয়েকটি শক্ত পদক্ষেপ নিতে যা আমাদের মিডিয়া বিশেষ করে টিভি চ্যানেলগুলোর জন্য অত্যন্ত শুভ।

টিআরপি নামক এক দৃশ্যমান আতঙ্ক আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোকে শেষ করে দিচ্ছিলো। তিনি সেখান থেকে আমাদের চ্যানেলগুলোকে বের করে এনেছেন। ক্যাবল অপারেটররা চ্যানেলগুলোর কাছ থেকে চাঁদা নিতো চ্যানেলটিকে উপরের দিকে রাখার জন্য। যে চ্যানেল বেশি টাকা দিতো সে চ্যানেল উপরের দিকে থাকতো। অন্যদিকে কয়েকটি ভারতীয় টিভি চ্যানেল পে চ্যানেলের নামে আমাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা নিয়ে যেতো প্রতিবছর কয়েকজন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে। আমরা হতাশ ছিলাম।

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ কড়া ব্যবস্থা নিলেন। চাঁদা নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি টিভি চ্যানেলকে সম্প্রচারের ক্রমানুসারে প্রথম দিকে রাখতে হবে তারপর ভারতীয় ও বিদেশী চ্যানেল। এই সিদ্ধান্ত যাতে বাস্তবায়িত হয় সেজন্য তিনি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার ব্যবস্থা করলেন। দ্রুতই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো। চ্যানেল সম্প্রচারে একটা শৃংখলা ফিরে এলো।
এরপর ড. হাছান মাহমুদ যে সিদ্ধান্ত নিলেন তার জন্য ভদ্রলোকের প্রতি বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল মালিকদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।

এদেশে ভারতীয় চ্যানেলগুলো জনপ্রিয় করার পেছনে টিআরপির একটা ভূমিকা ছিলো। আমাদের চ্যানেলগুলো যাতে বিজ্ঞাপন না পায়, একে একে চ্যানেলগুলো যাতে রুগ্ন হয়ে পরে সে নীলনকশা করা ছিলো। তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ সিদ্ধান্ত নিলেন এদেশে ভারতীয় চ্যানেল চালাতে হলে ‘ক্লিন ফিড’ চালাতে হবে। সেখানে কোনো বিজ্ঞাপন থাকবে না। তিনি আদেশ জারি করলেন। আমাদের ক্যাবেল অপারেটররা অসহযোগিতা শুরু করলেও তথ্যমন্ত্রী’র দৃঢ় মনোভাবের কারণে বেশিদূর এগুতে পারলো না। এখন ভারতীয় চ্যানেলগুলো ‘ক্লিন ফিড’ চালাতে বাধ্য হচ্ছে।

আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো এখনো রুগ্ন। তার প্রধান কারণ ভালো মানের অনুষ্ঠান নেই। আছে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি। কোনো নতুনত্ব নেই। কোনো সৃজনশীলতা নেই। মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রেও কোনো নতুন চিন্তা ভাবনা নেই। যে সব চ্যানেল এই সব সংকট থেকে নিজেরা বের হয়ে আসতে পারবে তারা এগিয়ে যাবে আমি নিশ্চিত।

খ ম হারূন; টেলিভিশন ও মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব।