বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯

ঈদের খাবার : যেসব বিষয়ে সতর্কতা জরুরি

প্রকাশিতঃ ২ মে ২০২২ | ৬:০৯ অপরাহ্ন


আ ব ম ফারুক : ঈদের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষঙ্গ সেমাই। সেই সেমাই কেনার সময় ভাজা সেমাই নয়, বরং কাঁচা সেমাই কিনুন, ঘরে নিয়ে ভেজে নিন। কারণ বেশির ভাগ সেমাই তৈরির কারখানা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় সেমাই তৈরি করে থাকে। প্রতিবছরের মতো এ বছরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অতি নিম্নমানের সেমাই তৈরির যেসব ছবি ও কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো খুবই মারাত্মক।

বিশেষ করে সেমাইগুলো শুকানোর পদ্ধতি অত্যন্ত নিম্নমানের। মূলত খোলা আকাশের নিচে রোদে শুকানোর ফলে এসব সেমাইয়ে মাছি বসে প্রচুর, ধুলাবালিও পড়ে। সেমাই রান্নার প্রক্রিয়ায় এগুলো থেকে আসা সব জীবাণু মরে যায় না। কিন্তু কাঁচা সেমাই কিনে ঘরে ভেজে নিলে আগুনের তাপে জীবাণুগুলো নিশ্চিতভাবে মারা যায়। বাজারে পাওয়া ভাজা সেমাইয়ে সে সুবিধাটুকু নেই। তা ছাড়া সেমাই রঙিন অর্থাৎ ‘ভালো করে ভাজা হয়েছে’ দেখানোর জন্য কোনো কোনো অসাধু ব্যবসায়ী এতে আবার টেক্সটাইল কালার অর্থাৎ কাপড়ের রং মেশান।

অবশ্য কাঁচা সেমাই কেনার সময় ধবধবে সাদা সেমাই না কেনার জন্যও পরামর্শ রইল। কারণ এগুলো ধবধবে সাদা করার জন্য হাইড্রোজ ব্যবহার করা হয়, যা ক্ষতিকর। দেখতে ভালো না হলেও কম সাদা কাঁচা সেমাই কেনা তাই সবচেয়ে ভালো।

লাচ্ছা সেমাইও অনেকের বেশ প্রিয়। তবে রঙিন লাচ্ছা দেখতে সুন্দর হলেও তা পরিহার করুন। কারণ রঙিন লাচ্ছায় থাকে টেক্সটাইল কালার। এসব টেক্সটাইল কালার চর্মরোগ, অ্যালার্জি, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, পাকস্থলীর গোলযোগ, পেপটিক আলসার, রক্তকণিকার গোলযোগ, লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সার, লিভারের নানা গোলযোগ, লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার, কিডনির মারাÍক ক্ষতি ইত্যাদি সৃষ্টি করতে পারে। তাই সাদা লাচ্ছাই কিনুন এবং তা যেন অবশ্যই কম তেল-চর্বিযুক্ত হয়। কারণ লাচ্ছা তৈরিতে ব্যবহৃত নিম্নমানের তেল ও চর্বি সহজে হজম হয় না।

চিনি কেনার সময় বেশি সাদা চিনি কেনা অনুচিত। কারণ চিনিকেও ধবধবে সাদা করতে ব্যবহৃত হয় ক্ষতিকর হাইড্রোজ। এ হাইড্রোজ নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। অনেকে মনে করেন হাইড্রোজ মানে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড, কিন্তু আসলে তা নয়। হাইড্রোজ মানে সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড বা সোডিয়াম ডাইথায়োনাইট। এটি ব্লিচিং এজেন্ট বলে চিনির স্বাভাবিক লালচে রংকে এ দিয়ে সাদা করা হয়। এসব ব্লিচ করা অতি সাদা চিনি দেখতে সুন্দর হলেও এটি মুখগহ্বর ও পাকস্থলীর জন্য ইরিটেন্ট অর্থাৎ প্রদাহ সৃষ্টিকারী। ফলে মুখে প্রদাহ এবং পাকস্থলীতে এসিডের অতিরিক্ত নিঃসরণ ঘটে, নিয়মিত ব্যবহারে যা আলসারে রূপ নিতে পারে। এ ছাড়া গরম পানিতে এ চিনি মেশানোর পর হাইড্রোজের কারণে সালফার ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়, যা পানির সঙ্গে মিশে সালফিউরাস এসিডে রূপান্তরিত হয়। ফলে পাকস্থলীর এসিড নিঃসরণ ও আলসার সৃষ্টির প্রবণতা আরো বেড়ে যায়। এ ছাড়া হাইড্রোজ কাশি, হাঁপানি, পালমোনারি ইডিমা বা ফুসফুসে পানি জমা, এমনকি নিউমোনাইটিস বা ফুসফুসের জটিল সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

ময়দা দিয়ে তৈরি খাদ্যসামগ্রীকেও ধবধবে সাদা করতে ব্যবসায়ীরা হাইড্রোজ ব্যবহার করেন। আমাদের তাই ধবধবে সাদা চিনি, সেমাই ইত্যাদি পরিহার করা উচিত। দেশি চিনি দেখতে খুব আকর্ষণীয় না হলেও এতে হাইড্রোজ দেওয়া হয় না বলে স্বাস্থ্যসম্মত। তা ছাড়া দেশি চিনির মিষ্টত্বও বেশি, প্রায় দেড় গুণ। ফলে অল্প পরিমাণ দেশি চিনিতে অনেকটা মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায়, যা বিদেশি সাদা চিনিতে পেতে পরিমাণে বেশি লাগবে। ফলে বিদেশি চিনির বদলে দেশি চিনি ব্যবহারে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম থাকে। তা ছাড়া আমরা সবাই দেশি চিনি কিনতে শুরু করলে দেশের চিনির মিলগুলো বিপুল লোকসানের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে টিকে থাকে।

ঈদে গরম মসলাও বিক্রি হয় প্রচুর। গরম মসলার দারচিনিতে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেজাল দেন লালচে দেখতে গজারি বা অন্যান্য ছাল দিয়ে। গজারির ছাল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, তবে একটু সতর্ক হলে এ ফাঁকিটুকু পরিহার করা সম্ভব। দারচিনি কেনার সময় বাছাই করে পাতলা ছাল দেখে কিনবেন, মোটা ও গন্ধহীনগুলো নয়।

ঈদে জর্দা খাওয়ার জন্য জাফরানি রং কিনতে গিয়ে আপনি ঠকবেন এটা মোটামুটি নিশ্চিত। কারণ জাফরানি রং অত্যন্ত দামি। ১০-২০ টাকার জাফরানি রং কোনো দোকানির পক্ষে বিক্রি করা সম্ভব নয়। জাফরানি রঙের বদলে তাই বিক্রি হয়ে থাকে একই রকম দেখতে টেক্সটাইল কালার, যা থেকে সৃষ্ট শারীরিক ক্ষতির কথা আগেই বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো রংহীন জর্দা খাওয়ার অভ্যাস করুন। নিতান্তই রঙিন জর্দা খেতে হলে গাজর বা বিটের কুচি কিংবা কমলার খোসা পিষে রসটুকু ব্যবহার করা যেতে পারে। একইভাবে পোলাউ বা বিরিয়ানিতেও কৃত্রিম রঙের ব্যবহার বর্জন করুন।

পোলাউ-বিরিয়ানি বা কোর্মাতে ঘি ব্যবহার না করাই ভালো। আজকাল বাজারের বেশির ভাগ ঘি কী দিয়ে তৈরি হয় তা আমরা র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অনেক বছর আগেই জেনেছি। পরবর্তী সময়ে র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট বিভিন্ন নকল ঘি কারখানায় ঘন ঘন অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল ঘি জব্দ করেছেন ও অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তি দিয়েছেন। কিন্তু তাতেও বাজারের বেশির ভাগ ঘি আসল হয়নি। এখনো অনেক অসাধু ব্যবসায়ী এই ক্ষতিকর কাজটি করে যাচ্ছেন। আসল ঘি খুঁজে পাওয়ার কষ্ট কমাতে ঘি পরিহার করে তাই সয়াবিন দিয়ে রান্না করাই ভালো। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমার পাশাপাশি রক্তে কোলেস্টেরল জমার আশঙ্কাও কমবে।

কেউ কেউ খাঁটি সরিষার তেলের পোলাউ-বিরিয়ানি রান্না করছেন। এর স্বাদও চমৎকার। তবে সরিষার তেল খাঁটি কি না তা নিশ্চিত হতে হবে। কারণ বাজারে কোনো কোনো কম্পানির বিক্রি করা সরিষার তেলে স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি ঝাঁজ দেখেই বোঝা যায় যে এগুলো নকল সরিষার তেল। এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট নামের রাসায়নিক উপাদান আসল সরিষার তেলের ঝাঁজের জন্য দায়ী। কিন্তু এই উপাদানটি এখন বিদেশে সিনথেসিস করে তৈরি করার কারণে কেমিক্যালসের দোকানে কিনতে পাওয়া যায় এবং মানুষের অজ্ঞতার কারণে প্রস্তুতকারকরা এ উপাদানটি স্বাভাবিক পরিমাণের চেয়েও বেশি করে মিশিয়ে ভেজাল সরিষার তেলকে বিশুদ্ধ বলে চালিয়ে দেন। অসচেতন মানুষ বেশি ঝাঁজের সরিষার তেলকে ভুল করে আসল মনে করে। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঝাঁজওয়ালা এসব সরিষার তেল আসলে ভেজাল তেল এবং এগুলো শরীরের জন্য বেশ ক্ষতিকর।

আমাদের বাজারের অনেক ব্র্যান্ডের হলুদ-মরিচ-ধনে-জিরার পাউডারে প্রায়ই ভেজাল পাওয়া যায়। বিশেষ করে হলুদ ও মরিচের গুঁড়ায় পাওয়া গেছে টেক্সটাইল কালার। এসব নকল মসলা দিয়ে রান্না করা তরকারিতে স্বাভাবিক স্বাদ থাকে না আবার তরকারিও হয় অধিক রঙিন। অনেক মসলা কম্পানির ভেজালের এই অত্যাচারের ফলে আমাদের আবারো শিল-নোড়ার যুগে ফিরে যেতে হয় কি না কে জানে।

টেক্সটাইল কালারের কারণে বাজারের বেশির ভাগ সস ও আচার খাওয়ার অযোগ্য। ইউরোপের বাঙালিদের জন্য বাংলাদেশের দুটি অত্যন্ত বিখ্যাত কম্পানি শুকনা মরিচের আচার রপ্তানি করতে গিয়ে অত্যন্ত বিপাকে পড়েছিল। (জনস্বাস্থ্য রক্ষার কারণে ভেজাল খাদ্য প্রস্তুতকারী এসব কম্পানি ও ব্র্যান্ডের নাম বলাই উচিত। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, নাম বললে এসব প্রচণ্ড ধনী কম্পানির খুব রাগ হয়। সেই রাগ আমরা দুর্বলরা সামাল দিতে পারি না। তারা তখন বলে ‘আমাদের ব্র্যান্ডের তি করা হলো কেন?’ কপাল! তাদের কাছে মানুষ মারা যাওয়াটা তি নয়, তি হয় ব্র্যান্ডের বদনাম হলে!) ভেজাল খাদ্য আটককারী সেসব দেশ আমাদের দেশের মতো নয় যে কেন্দ্রীয় সংস্থার পরীক্ষা ছাড়াই যা খুশি খাদ্যসামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানি করা যায়। তারা পরীক্ষা করে শুকনা মরিচের আচারে ক্যান্সার তৈরি করে বলে নিষিদ্ধ রং ‘সুদান রেড’ পেয়েছিল। তারা অবাক হয়েছে যে কয়েক যুগ আগে বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ রং সুদান রেড বাংলাদেশের কম্পানি তাদের খাদ্যসামগ্রীতে মেশায় কী করে, ওটা পায় কোথায়? তারা জানে না যে আমরা সুদান রেড উৎপাদন করি না, এটি আমদানি করা হয়। আমদানির অনুমতি যে কর্মকর্তারা দেন, তাঁরা জানেন না যে এটি অত্যন্ত বিষাক্ত এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী!

ক্ষতিকর বা নিষিদ্ধ টেক্সটাইল কালার আমাদের দেশে জ্যাম, জেলি, চানাচুর, বিস্কুট, কেক, লজেন্স, চকোলেট, আইসক্রিম, দই, মিষ্টি ইত্যাদি তৈরিতে এখনো দেদার ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের দেশে শরবত তৈরিতে ব্যবহৃত প্রায় সব পাউডার গ্রানিউলস ও কনসেনট্রেটে ক্ষতিকর বা নিষিদ্ধ টেক্সটাইল কালার রয়েছে। এগুলো ব্যবহারে তাই সাবধান হওয়া উচিত।

ঈদের উপাদেয় খাবার খাওয়ার পর দই খেতে আমরা খুব পছন্দ করি। আমাদের মিষ্টির দোকানগুলোর তৈরি দইগুলোর বেশির ভাগই হলুদ রঙের। কিন্তু আমাদের উপলব্ধি করা উচিত যে দই হলুদ রঙের হতে পারে না। যত গাঢ় দুধ দিয়েই তা তৈরি হোক না কেন, দই সাদাই থাকবে, বড়জোর অফ হোয়াইট হতে পারে, কিন্তু হলুদ কখনোই নয়। আপনার স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে যেসব মিষ্টির দোকানে টেক্সটাইল কালার মেশানো হলুদ রঙের দই বিক্রি হয়, সেগুলো বর্জন করুন এবং সাদা রঙের দই কিনুন। মিষ্টির বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। রঙিন মিষ্টি, যেমন কালোজাম, মনসুর, বুন্দিয়া, জিলাপি ইত্যাদিতে রং আনার জন্য কোনো ফুড কালার ব্যবহার করা হয় না। এগুলোতে ব্যবহৃত হয় টেক্সটাইল কালার। তাই স্বাস্থ্য রক্ষার কারণে কৃত্রিম রংহীন মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস করুন।

ঈদের দিনে বাচ্চারা আম-কমলার রসের প্যাকেট বেশ পছন্দ করে। তবে বেশির ভাগ তথাকথিত জুস মূলত কৃত্রিম, কিন্তু প্যাকেটের গায়ে উন্নত দেশের মতো ‘কৃত্রিম জুস’ কথাটি লেখা থাকে না। এগুলোতে আম-কমলার ছবি আছে, তবে আম-কমলার উপযুক্ত উপস্থিতি নেই। তা ছাড়া এগুলোতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এমন সব কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়। বিজ্ঞাপনের মোহে পড়ে বিশেষ করে বাচ্চারা যেন এসব তথাকথিত জুস নিয়মিতভাবে খেতে শুরু না করে সে বিষয়ে সতর্ক হোন। কারণ বাচ্চাদের লিভার-কিডনি-অস্থিমজ্জা-ফুসফুস সবই অপরিণত বলে ক্ষতিকর রংগুলো বড়দের চেয়ে বাচ্চাদের ক্ষতি করে বেশি।

অন্যান্যবারের মতো এবারের ঈদেও সম্ভবত প্রচুর কোল্ড ড্রিংকস খাওয়া হবে। মাঝেমধ্যে পরিমিত পরিমাণে কোল্ড ড্রিংকস খাওয়া ক্ষতিকর নয়, তবে বেশি পরিমাণে কিংবা নিয়মিত খাওয়া ক্ষতিকর। বিশেষ করে বাচ্চাদের কোলাজাতীয় কোনো কোল্ড ড্রিংকস দেবেন না। কারণ এর উচ্চ মাত্রার ক্যাফেইন বাচ্চাদের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে, মেজাজ খিটখিটে করে, অস্থিরতা আনে, লেখাপড়া ও গভীর মনোসংযোগে বিঘ্ন ঘটায় এবং কিডনিকে চাপে ফেলে। অতিরিক্ত কোলাজাতীয় কোল্ড ড্রিংকস বড়দের জন্যও ক্ষতিকর, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের ও হৃদরোগীদের জন্য। উপরন্তু এর টারটারিক এসিড ও সাইট্রিক এসিড হাড়ের থেকে ক্যালসিয়াম ক্ষয় বাড়িয়ে দেয়, বয়স্ক মানুষের জন্য যা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ছাড়া এর উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন হালকা নেশাও সৃষ্টি করে। বিকল্প হিসেবে আপনি বরফ মিশিয়ে লেবুর শরবত খান। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও নিরাপদতম কোল্ড ড্রিংকস সম্ভবত লেবুর ঠাণ্ডা শরবত। চেষ্টা করে দেখুন না অভ্যস্ত হতে পারেন কি না।

বাজারে এখন বেশ কিছু এনার্জি ড্রিংকস বিভিন্ন নামে পাওয়া যাচ্ছে। ঈদের দিনে উৎসবের আমেজে অনেকে হয়তো এনার্জি ড্রিংকসও খাবে। মনে রাখতে হবে, অতি উচ্চমাত্রার সুগার ও ক্যাফেইন উপাদানের কারণে এগুলো বাচ্চাদের জন্য নয়, প্রবীণদের জন্যও নয়। এ ছাড়া নিষিদ্ধ কোনো উত্তেজক এগুলোতে মেশানো হয়েছে কি না জানার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। ততদিন শুধু তরুণরা এগুলো অতি পরিমিত মাত্রায় খেতে পারে, কিন্তু বৃদ্ধ ও বাচ্চারা কখনোই নয়। তবে তরুণদের মধ্যেও যারা স্থুলকায় এবং যাদের উচ্চ রক্তচাপ কিংবা কিডনির কার্যকারিতার মৃদু হলেও অস্বাভাবিকতা রয়েছে, তাদেরও এসব এনার্জি ড্রিংকস খাওয়া উচিত নয়।

এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, ২০০৩ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এনার্জি ড্রিংকস উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হয়। যে দুটি এনার্জি ড্রিংকস উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হয়, সেগুলো নাকি ছিল ‘নন-অ্যালকোহলিক’। কিন্তু কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং আমরা কৌতূহলবশত পরীক্ষা করে এতে অ্যালকোহলের উপস্থিতি পাই। গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রচুর সমালোচনার মুখে তখনকার শিল্পমন্ত্রী, যিনি ছিলেন একটি ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলের প্রধান, তিনি আমাদের পরীক্ষার রিপোর্টকে প্রত্যাখ্যান করে পুনরায় ঘোষণা করেন যে এগুলোতে কোনো অ্যালকোহল নেই। তখন ছিল পবিত্র রমজান মাস। এ রকম পবিত্র মাসে মদসমৃদ্ধ দুটি ড্রিংকস বাজারজাত করার জন্য একটি ধর্মভিত্তিক দলের প্রধান কিভাবে অনুমতি দিলেন এবং তারপর আবার কম্পানির হয়ে সাফাই গাইলেন, দেশের সচেতন মানুষ তা মেলাতে পারছিলেন না।

পরদিন কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আমি বলেছিলাম, ‘দেশের লোক মনে করে তিনি পরহেজগার মানুষ। তিনি যদি টেলিভিশনে সবার সামনে এই ড্রিংকস দিয়ে ইফতার করতে পারেন, তাহলে আমরা পরীক্ষার রিপোর্টে ভুল আছে বলে ধরে নেব এবং আমাদের অভিযোগ প্রত্যাহার করব। ’ সুখের বিষয়, পত্রপত্রিকায় তুমুল সমালোচনার পর সরকার কয়েক দিন পরেই এই এনার্জি ড্রিংকস দুটির অনুমোদন বাতিল করে। এখনকার এনার্জি ড্রিংকসগুলোতে আমরা এখনো কোনো অ্যালকোহল পাইনি। তবে উত্তেজক হিসেবে এতে কী মেশানো হয়, বাংলাদেশের ক্রেতা-ভোক্তাদের পে আমরা তার অনুসন্ধান চলমান রেখেছি।

কেউ যদি ভেবে থাকেন যে শুধু আমাদের দেশে তৈরি পণ্যগুলোতেই ভেজাল থাকে, অতএব এগুলোর বদলে বিদেশি খাদ্যসামগ্রী কেনাই ভালো- তাহলে ভুল করবেন। আমদানি করা অনেক খাদ্যসামগ্রীতেও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব উপাদানের মধ্যে ক্ষতিকর রং, ক্ষতিকর টেস্টিং সল্ট এবং ক্ষতিকর কৃত্রিম মিষ্টিকারক বা আর্টিফিশিয়াল সুইটেনার প্রধান। অনেক সময় এই বিদেশি পণ্যগুলোতে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও উল্লেখ থাকে না। পণ্যে ব্যবহৃত সব কটি উপাদানও বিদেশি কম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখ করে না। খুচরা মূল্য লেখা না থাকা তাদের আরেক কারসাজি। তারা আমাদের দেশের কোনো কেন্দ্রীয় খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অনুপস্থিতি ও দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার পুরো সুযোগ নেয়। তাই বিদেশি খাদ্যসামগ্রী কেনার সময়ও সতর্কতার সঙ্গে দেখেশুনে কেনার কোনো বিকল্প নেই।

আমরা চাই সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সেভাবে আমাদের দেশে উৎপাদিত সব খাদ্যসামগ্রী, বিশেষ করে প্রসেসড ফুডগুলো ভেজালমুক্ত হোক, এগুলোর মান আরো উন্নত হোক। এত বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশে যদি সব ধরনের খাবার বিশুদ্ধ, পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ও ভেজালমুক্ত না হয়, তাহলে জাতির জন্য তা যেমন দুর্ভাগ্যজনক, তেমনি এর ফলে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও জনগণের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যয়ও অনেক বেড়ে যায়। এতে দেশের জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব মানুষ। তাই সতর্কতার সঙ্গে খাদ্যসামগ্রী কেনার মাধ্যমে সবার জন্য এবারের ঈদ হোক অসীম আনন্দের ও সুস্বাস্থ্যের।

লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়