বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯

আমার চোখে তুমিই সেরা

প্রকাশিতঃ ১৪ জুন ২০২২ | ১:০৮ অপরাহ্ন

ঢাকা : স্বামী আবদুল মান্নানকে স্বাস্থ্য সচিব পদে দেখার পাঁচদিন পর মারা গিয়েছিলেন কামরুন্নাহার জেবু; তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই তার পরিবার, সন্তান ও অপূর্ণ স্বপ্নগুলোকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন স্বামী আবদুল মান্নান। দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রিয় মানুষকে ঘিরে স্মৃতিচারণ করলেন তিনি।

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৮ম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. আবদুল মান্নান আজ মঙ্গলবার ‘মম সরসীতে তব উজল প্রভা’ শিরোনামে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। লেখাটি একুশে পত্রিকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।

বাংলা গীতিকাব্যের বরপুত্র শ্রী গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের বিখ্যাত একটি গানের অন্তরা থেকে এবারের লেখার শিরোনামটি ধার করে নিলাম। শিল্পী মান্না দে’র গাওয়া ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবিতে ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে – ভাতিছ গগন মাঝে’- গানটি আমার এবং জেবুর উভয়েরই ভীষণ প্রিয় ছিল। সড়ক পথে যেতে যেতে কতবার যে এ গান আমরা শুনেছি এর হিসাব কে রাখে? গানটিতে ব্যবহৃত বাংলা শব্দের দ্যুতিময়তা, অনুপ্রাস এবং উপমায় আমার মত জেবুও একসময় বিমোহিত হয়েছিল। সে বলতো- ‘অনেকবার শুনতে শুনতে আমারও প্রিয় গান হয়ে উঠেছে এটি’।

আজ আমার প্রয়াত স্ত্রী জেবু’র দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁকে ছাড়াই আমরা পুরো দু’বছর ধরে আছি। অর্থাৎ এ গ্রহে আরও ৭৩০ দিন পেছনে ফেলে এসেছি। ভাবলে হতচকিত হয়ে উঠি। অবাক করে তোলে আমাদের পরিবারের সবাইকে। যাকে বাদ দিয়ে বাচ্চারা একবেলার জন্যও স্বাচ্ছন্দবোধ করতো না – অথচ তাঁর এই সাজানো সংসারে সে নিজেই নেই বিগত চব্বিশ মাস যাবৎ। তাই আজকে তাঁকে একটা পত্র লিখে বলতে ইচ্ছে করছে তোমার আকস্মিক অনুপস্থিতিতে আমরা কোথায় কেমন করে আছি? ঠিক শরৎচন্দ্রকে লেখা ভূপেন হাজারিকার খোলা চিঠির মতন– ‘এ চিঠি পাবে কিনা জানি না’। যদিও এ গানের কথা রচনা করেছিলেন প্রখ্যাত গীতিকার শিবদাস বন্দোপাধ্যায়।

তোমাকে বলছি,
পৃথিবীর সকল মৃত্যুই সবকিছুকে বিলুপ্ত ও বিলীন করে দেয়। কাজেই দিনশেষে মানুষ নিয়ত ভুলে গিয়েই বাঁচতে চায়। প্রিয়জন হারানোর ব্যথা-বেদনাও নাকি ক্ষণিকের। এটি স্থায়ী রূপ ধারণ করলে মানুষের বাঁচা কঠিনতর হত। ভুলে যাওয়াই যেন জীবজগতের চিরন্তন উপশম। কিন্তু আমার বেলা হয়েছে উল্টো। যত দিন যাচ্ছে তোমার প্রতি আমার শোক ও দায় বেড়েই চলেছে। সংসারে তোমার অদৃশ্য ঋণের ভারে আমরা প্রত্যেকেই জর্জরিত হয়ে আছি। আজকাল সন্তানেরা বলে তোমার কারণে তারা আজকের অবস্থানে, আত্মীয়-স্বজনরা বলে তোমার উছিলায় তারা এখন ভালো আছে। গ্রামের নিম্নবিত্ত মহিলারা তোমার কবরের কাছে এসে এখনো অশ্রুসিক্ত হয়। তোমার মমতা ও মহত্ত্বের বন্দনায় তারা পঞ্চমুখ।

আমি বলি, তোমার চলে যাওয়ার সাথে সাথে সমাজে, সংসারে বা রাষ্ট্রে আমার সরব অস্তিত্বের সংকট প্রকট হয়েছে। এখন কোথাও নেই আমি অথচ কেমন করে যেন বেঁচে আছি। মনে হয়, আজও সারা দিনমান আমার বিচিত্র ভাবনার আকাশ জুড়ে তুমি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত প্রিয়জনকে হারালেন, তিনি যেন মৃত্যুর মিছিলে ডুবে ছিলেন। আবার বললেনও, “বেদনা সবসময় ক্ষণিকের, বিস্মৃতিটাই স্থায়ী”। এখন এমন কথাতে আমি প্রভাবিত হই না। মাঝেমধ্যে ভাবি, হাসপাতালের মৃত্যু শয্যায় তোমার সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ করাটা খুব জরুরি ছিল। কী এমন ভয় ছিল অভিশপ্ত করোনার? কেন ডাক্তারের বারণ উপেক্ষা করে তোমার শিয়রের পাশে দাঁড়াই নি? সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিচে প্রতিদিন ঘুরেছি, দুশ্চিন্তায় আকাশের দিকে তাকিয়ে পায়চারি করেছি। উপরে ওঠা হয়নি।

ঊর্ধ্বলোকে থেকে তুমি হয়তো দেখেছ, তোমার পরে তিন সন্তান, জামাই এবং আমি সবাই করোনাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালকে অস্থায়ী ঠিকানা করে নিয়েছিলাম। কিন্তু মরতে মরতেও কেমন করে যেন আমরা বেঁচে যাই। স্বাস্থ্য সচিব হিসেবে তুমি আমাকে মাত্র পাঁচ দিন দেখে গেছ। তবে দশ মাসের মত টিকে ছিলাম ওখানে। আমার জন্য এটাও কম কী বল? তোমার অনেক আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তা থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুর কাছে পরাজিত হলে। জান, তোমার এমন অকাল মৃত্যুতে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে শোকবার্তা প্রকাশ করা হয়েছিল। এর জন্য আমরা অকুন্ঠ চিত্তে কৃতজ্ঞতা জানাই।

তোমার যাবার কালে দেশে করোনায় এক হাজার মানুষও মৃত্যুবরণ করেনি। এখন ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। তোমার পরে পৃথিবী থেকে আরও প্রায় অর্ধ কোটি মানুষ এই ভয়ঙ্কর অস্পৃশ্য ও বায়বীয় রোগে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। ইদানিং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করতে গিয়ে তোমার স্মৃতি, তোমার চলাচল এমনকি তোমার পদচিহ্ন খুঁজি। আর তোমার অবিচ্ছিন্ন ছায়াও যেন আমার সাথে সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অফিসার্স ক্লাব বা লেডিস ক্লাবের সাবেক কমিটির সদস্য যাঁদের সাথে তুমি ছিলে, এঁদের প্রায় সবাই দিব্যি ভালো আছেন। কালেভদ্রে হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেলে তোমার জন্য তাঁরাও অশ্রুসজল হন।

বিশ্বাস করো,
তোমার সর্বাধিক ত্যাগ ও কষ্টে তৈরি গ্রামের বাড়ি, গৃহস্থালি গরু, গাছপালা, শাকসবজি লেবু, কবুতরের বাসা সবই ঠিকঠাক আছে। শফিক আজো এগুলো সযত্নে পালন ও লালনের ভার নিয়েছে। সাজেক ভ্যালি থেকে নিয়ে আসা সেই ফন্সি (কুকুর ছানা) অনেক অবহেলিত হয়েও মান অভিমানে আমাদের সাথেই আছে। মনে হয় এখনো তোমার পথ চেয়ে বসে থাকে। আমাদের বিরুদ্ধে তার পাহাড় সমান অভিযোগ। তোমার ছোট ছেলে অম্লান একে কোথাও যেতে দিবে না। সপ্তাহান্তে ভিডিও কলে ওকে দেখে। কাজেই ফন্সিকে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির জিম্মাদারিতে দেয়া যাচ্ছে না।

তোমার সেই ছেলে কিন্তু যশোরে বিমানবাহিনীর ট্রেনিং করছে। আহা! এখন ছেলের জন্য তোমার কত যে চিন্তা থাকত! ইদানিং আমি প্রায়ই ভাবি, সংসারে তোমার অনিঃশেষ অবদানের কথা জীবদ্দশায় তোমাকে বলা হয়নি। এটা আমার এক প্রকার অপরাধ। তোমার তিন দশকের বিরামহীন শ্রমের যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে পারি নি। পৃথিবীতে মানুষের নিয়তিই বুঝি এমন, সবসময় কাছাকাছি বাস করলে এর মূল্য বা কদর কেউ বোঝে না। আরও একটি কথা- মা-বাবা, ভাই-বোন, নিকট আত্মীয়- বলতে পার আর কারও মৃত্যু বা অকস্মাৎ চলে যাওয়া আমাকে এতটা বিচলিত, মর্মাহত বা বেদনার্ত করতে পারে নি। শুধু তোমার ক্ষেত্রে আমার হৃদয়ে নিরন্তর রক্তক্ষরণ, যা থামছেই না।

জানো, তোমার চলে যাওয়ার এতদিন পরেও আমাদের মেয়েকে মনের অজান্তে ভুল করে তোমার নামে সম্বোধন করে বসি। কী লজ্জা বলতো- জামাই কী ভাববে? আজকাল পুরনো এ্যালবাম দেখেও সময় কাটাই। মাঝে মধ্যে আমার দশ বছরের টুকিটাকি লেখার ডায়েরিটাও অলক্ষ্যে চোখে জল এনে দেয়। আগে এমনটা হয়নি। তোমার আর বাচ্চাদের ছবিগুলোর সন, তারিখ ইত্যাদি স্মরণ করে কখনো আনন্দ আবার কখনো দুঃখ অনুভব করি। চাকরির একেবারে শুরুর দিকের ছবিগুলো আমাকে বেশি কষ্ট দেয়। আমাদের কিছুই ছিল না অথচ চারপাশে কত স্বপ্নাতুর মায়াবী অনুভূতি ছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জীবনে একটি সাদা-কালো টিভি কিনতে গিয়ে দু’জনে কতবার কিস্তির হিসেব গুনেছি। আমার মনে পড়ে, কী প্রগাঢ় ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নিত্য টানাপোড়েনের ছোট্ট সংসারকে তুমি জয় করেছিলে। এ কাজে সত্যিই তুমি ছিলে অতুলনীয়া ও অনন্যা।

দ্যাখো, তোমাকে আসল কথাটি বলা হয়নি, এ পৃথিবীতে তোমার শেষদিনের শেষ মুহূর্তে আমি ইচ্ছে করেই তোমার মুখটি দেখি নি। অনেকে বললেও আমি তা পারি নি। করোনায় আক্রান্ত হয়ে পাঁচ দিন হাসপাতালে- শুনেছি শেষ নিশ্বাসের পূর্বে হার্টঅ্যাটাকে তোমার রক্তক্ষরণ হয়েছিল, সত্যি বলছি, এগুলোসহ এক অচেনা রূপে আমি তোমাকে দেখতে চাই নি। আমার চোখে তুমিই সেরা ছিলে, আছ এবং থাকবে।

১৪ জুন, ২০২২ খ্রিঃ
৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ।