
ফারুক আবদুল্লাহ : ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকেই করোনাভাইরাসের প্রথম উৎপত্তি ঘটে। বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে বা এখনও চালাচ্ছে প্রাণঘাতি এই ভাইরাস। চীনে করোনার প্রকোপ অনেকটা কমে এলেও নতুন করে সংক্রমণ আবার বাড়ছে। এমন পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন দেশটির শীর্ষ মহামারি বিশেষজ্ঞ ঝঙ নানশান।
এদিকে চীনের জিরো কোভিড নীতি নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ থেকে দেশটির এক ডজনের বেশি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। ১৯৮৯ সালে দেশটির তিয়েনআনমেন স্কয়ারে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তারপর এত বড় বিক্ষোভ আর হয়নি।
বলতে গেলে কয়েক দশকের মধ্যে এটিই প্রথম দেশব্যাপী বিক্ষোভ, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সাধারণ চীনা নাগরিকদের একত্র করেছে।
জিনজিয়াং প্রদেশের উরুমকি এলাকায় লকডাউনের আওতায় থাকা একটি ভবনে আগুন লেগে ১০ জন লোক মারা যাওয়ার পর মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গুইঝো প্রদেশে সম্প্রতি কিছু লোককে বাসে করে কোয়ারেন্টিনে নেওয়ার পথে দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত হওয়ায় বিক্ষোভ সারা দেশে প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ শিংজিয়াংয়ে বহুতল ভবনে আগুনের ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শনিবার সাংহাই শহরে জড়ো হয় কয়েকশ’ মানুষ। এ সময় তারা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে বাধা দেয় পুলিশ। ব্যাপক লাঠিচার্জের পাশাপাশি শুরু হয় ধরপাকড়। আটক করা হয় বেশ কয়েকজনকে।
একইদিন চীন সরকারের জিরো কোভিড নীতির বিরুদ্ধে উহানে জড়ো হন শত শত মানুষ। এ সময় রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা। করোনা বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেয়ার পাশাপাশি সরকারের সমালোচনা করেন বিক্ষোভকারীরা।
নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক কড়াকড়ি আর ধরপাকড়ের কারণে চীনে বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষোভ হলেও তাদের সমর্থনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে চীনা বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে জড়ো হন কয়েকশ মানুষ। ব্যানার ফেস্টুন হাতে চীন সরকারের দমন-পীড়নের তীব্র সমালোচনা করেন তারা
এ ছাড়া জার্মানির রাজধানী বার্লিনে চীনা দূতাবাসের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে শত শত চীনা অভিবাসী। এ সময় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পদত্যাগের দাবি জানান তারা। এক বিক্ষোভকারী বলেন, এই আন্দোলন হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। চীনের কর্তৃত্ববাদী শাসকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই আজকের এ আন্দোলন।
নতুন এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণ সম্প্রদায়। তাদের এই সামাজিক প্রতিবাদগুলো শুধু কোভিড-১৯ নীতির বিরুদ্ধে নয়, তারা দেশের শাসন ও রাজনীতিতেও পরিবর্তনের ডাক দিতে শুরু করেছেন। চীন থেকে বের হতে থাকা এই দৃশ্যপটের প্রধান বার্তা হলো: আমলাতন্ত্রের নীতি বিতর্ককে ক্রমবর্ধমান দমনপীড়নের মাধ্যমে যতই দমিয়ে রাখা হোক না কেন, তা রাতারাতি সামাজিক অস্থিরতার বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেন।
হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়া করোনা বিধিনিষেধবিরোধী বিক্ষোভ রূপ নিয়েছে সরকারবিরোধী আন্দোলনে। এতে বেশ বেকায়দায় পড়েছে শি জিনপিং প্রশাসন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এরই মধ্যে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করেছে চীন সরকার। যদিও এই মুহূর্তে চীনে কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণের মাত্রা বাড়তি থাকা সত্ত্বেও দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদের মুখে সাংহাইয়ের পর আরও বেশ কয়েকটি শহরে শিথিল করেছে করোনা বিধিনিষেধ। রাজধানী বেইজিংয়ের বিভিন্ন জায়গা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে কোভিড পরীক্ষা কেন্দ্র।
এদিকে জনগণের ব্যাপক বিক্ষোভের জেরে চীনের সরকার বিতর্কিত ‘জিরো কভিড’ নীতি থেকে সরে আসার পর থেকে রীতিমতো বিশৃঙ্খল এক পরিস্থিতিতে পড়েছে দেশটি। চীনে রাজধানী পেইচিংসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। সেই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনার বিভিন্ন উপসর্গে ভুগতে থাকা রোগীদের ভিড়। এই কারণে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যেসব স্বাস্থ্যকর্মী হোম আইসোলেশনে আছেন, তাদেরও অবিলম্বে কাজে যোগ দিতে নোটিশ দিয়েছে বিভিন্ন হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ। এতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চেন শি চীনের সরকারি স্বাস্থ্যনীতির একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলছেন, ‘করোনায় আক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিতে আসেন, সেক্ষেত্রে হাসপাতালগুলো করোনার এপিসেন্টারে পরিণত হবে।
তাছাড়া করোনা বিধিনিষেধ হঠাৎ শিথিল করায় চীনে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্য সংস্থা ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স এবং অ্যাভ্যুলেশন (আইএইচএমই)। তারা বলছে, চীনে ২০২৩ সালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
আইএইচএমই পরিচালক ক্রিস্টোফার মুরে বলেন, ‘আমার ধারণা, আগামী বছরের এপ্রিলে চীনে করোনার সংক্রমণ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এমনকি, ওই সময়ের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চীনের ৩ লাখ ২২ হাজার মানুষ মারা যেতে পারেন। পাশাপাশি দেশটির চার ভাগের তিন ভাগ মানুষ প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, চীন এত দীর্ঘ সময় জিরো কোভিড নীতি অব্যাহত রাখবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি। কঠোর নীতির কারণে প্রথমদিকে করোনাভাইরাসের অন্যান্য ধরন নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ওমিক্রনের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে চীনকে।